কেমন আছে রোহিঙ্গা শিশু

আলোকিত সকাল ডেস্ক

যে বয়সটা হওয়ার কথা ছিল ভয়হীন দুরন্ত শৈশবের, ঠিক সেই বয়সে রোহিঙ্গা শিশুরা ভয়ার্ত পরিবেশে বিক্ষিপ্ত শৈশবে পাড়ি দিচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। অরক্ষিত ক্যাম্পে, পলিথিন আর বাঁশে তৈরি অনিরাপদ আশ্রয়ে এক উপেক্ষিত জীবন নিয়ে বেড়ে উঠছে তারা।

কক্সবাজার উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও টেকনাফের নোয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে শিশুদের বিবর্ণ জীবন চোখে পড়েছে। শিশুদের মাঝে কোথাও আনন্দ নেই, হাস্যোজ্জ্বল জীবন নেই, কেমন যেন বিষাদে ভরা এক জীর্ণ বসতিতে তারা পার করছে এক ভয়ার্ত জীবন।

বিশ্বব্যাপী শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের তথ্য অনুসারে, রোহিঙ্গা শিশুদের সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও মানবপাচারসহ অনেক কিছু।

এছাড়া বিরূপ পরিবেশের কারণে গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যু ঝুঁকিতে রয়েছে রোহিঙ্গা শিশুরা। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ বলছে, শ্বাসতন্ত্র সংক্রান্ত জটিলতা এবং পানিবাহিত রোগ এখানকার প্রধান সমস্যা। তবে সম্প্রতি ডিপথেরিয়ার প্রাদুর্ভাবে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে, এই রোগীর ৭৫ শতাংশই ছিল শিশু। প্রাকৃতিক দুর্যোগের চরম ঝুঁকিতেও রয়েছে এসব শিশু।

ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম ঝুঁকির মধ্য রয়েছে। বলা হয়েছে, ওরা বাঁশ ও প্লাস্টিকের দুর্বল কাঠামোয় গড়ে তোলা আশ্রয়স্থলগুলোতে বসবাস করে; যা কোনোভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষম নয়।

জেআরপি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৭০০ রোহিঙ্গা শিশু রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনেক শিশু আছে, যাদের মা বাবা নেই, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে নির্মম হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে তাদের পরিবারের আপনজনরা।

সেভ দ্য চিলড্রেনের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের শিশুরা এই মুহূর্তে পৃথিবীতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের ৫০ শতাংশেরই বাবা অথবা মা নেই। তাদের প্রতি দুজনের একজন মা অথবা বাবা হারিয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মা-বাবা কিংবা কোনো পরিবারের সদস্য ছাড়াই তারা বেড়ে উঠছে। ক্যাম্পের পরিবেশে এই শিশুরা পাচার, বাল্যবিয়ে ও অন্যান্য ধরনের নির্যাতনের বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষণায় আরও বলা হয়, কক্সবাজারে ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ছয় হাজারের বেশি পিতৃ-মাতৃহীন রোহিঙ্গা শিশু বসবাস করছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের রিজিওনাল মিডিয়া ম্যানেজার (এশিয়া) ভানু ভাটনাগর দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, রোহিঙ্গা শিশুদের শৈশব মোটেও মসৃণ নয়। এই শিশুরা শোষণ ও পাচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আর এই শিশুদের মানসিক সহযোগিতাও খুব দরকার। কারণ তারা এত বেশি আঘাতমূলক ঘটনার মধ্যদিয়ে গিয়েছে, সেসব দুঃসহ স্মৃতির বোঝা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাদের।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ন্ত্রণহীন শিশু জন্মহার
এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়েই চলছে শিশুজন্মের হার। বলা হচ্ছে, উচ্চ জন্মহারে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে গত ২০ মাসে লক্ষাধিক শিশুর জন্ম হয়েছে। বর্তমানে ক্যাম্প গুলোতে সন্তান সম্ভবা রয়েছে আরও অন্তত ২০ হাজার নারী।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০টি শিশু জন্ম নিচ্ছে। এ হিসাবে মাসে জন্ম নিচ্ছে অন্তত ১৮০০ শিশু। এমন উচ্চ জন্মহারে ভয়াবহ সংকটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জন্ম নেওয়া এই শিশুরা ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তবে ধর্মান্ধতার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণকে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের অধিকাংশই ‘পাপকাজ’ মনে করেন। তাই তারা কোনো ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে আগ্রহী না।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box