কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংক মানবতার কল্যাণে কাজ করাই যাদের নেশা

আব্দুল ওয়াহাব নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ জাকারিয়া পেশায় কৃষক । এমনিতে জীবন চলে দারিদ্রতার সাথে সংগ্রাম করে। অন্যদিকে দুই মেয়ে এক ছেলে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। প্রতি সপ্তাহে সন্তানকে রক্ত দিতে হয়। একদিন লোহাগাড়ার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারে কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংকের কথা। যোগাযোগ হয় উক্ত সংগঠনের সভাপতি রাকিবুল হাসানের সাথে জানান তার অসহায়ত্বের কথা। সেই সময় থেকে গত দুই বছর ধরে নিয়মিত তিনজনকেই রক্ত দিয়ে যাচ্ছে কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংকের সদস্যরা।

এ বিষয়ে কথা হয় কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাতকানিয়া সরকারি কলেজের এইচ.এস.সি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাকিবুল হাসানের সাথে শুরুর দিকের গল্পটা জানতে চাইলে সে জানান একদিন এক অচেনা মানুষ আমার মোবাইলে ফোন করে বলে ভাই আমার স্ত্রীর জন্য রক্তের প্রয়োজন তখন আমি জিজ্ঞাস করলাম রক্তের গ্রুপ কি? সে উত্তর দিল বি নেগেটিভ।

এর পরে বিস্তারিত তথ্য নিলাম এবং বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করলাম। যোগাযোগ করার পরেও রক্তের সন্ধান পেলাম না। ঐ দিনে মনে মনে ভাবতে লাগলাম যদি একটি ব্লাড ব্যাংক থাকত তাহলে হয়তো খুব দ্রুত রক্তের সন্ধান পাওয়া যেত। এর পরে “কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংক” নামক একটি সংগঠন করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। সংগঠনটি কিভাবে সংগঠিত করব তা নিয়ে আমার পিতা (মনোয়ার হোসেন) এর সাথে পরামর্শ করলাম। তিনি আমাকে সব ধরনের সহযোগীতা করবেন বলে জানান।

তার পর শুরু পথচলা। ২০১৭ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী একজন মুমূর্ষ মহিলাকে এ পজেটিভ রক্তদানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করলাম “কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংক” এর কার্যক্রম। সেই দিন থেকে নিয়মিত রক্তদান করে যাচ্ছেন সংগঠনের সদস্যরা। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করার কিছুদিন পরে আমার সাথে মানবতার কল্যাণে কাজ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন কুতুব উদ্দীন, ওমর ফারুক, ইরফান মোহাম্মদ আল সামির, ফাহমিদা সোলতানা ও জেনিয়া সোলতানা, জান্নাতুল মুক্তা সহ তরুণ প্রজন্মের অনেকেই।

সবাই মিলে যখন মানবতার কল্যাণে কাজ করতে শুরু করলাম তখন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল “কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংক” এর স্বেচ্ছাসেবক ও সদস্য। বর্তমানে সংগঠনের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৯০০ জন। তারা প্রতিনিয়ত রক্ত দিচ্ছে কোন না কোন রোগীকে। এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০০ রোগীকে রক্ত দিয়েছে আমাদের সদস্যরা।

শুরু থেকেই বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প, শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ, বৃক্ষরোপণ, বিভিন্ন দিবস উদযাপনসহ নানান রকম কার্যক্রম করে যাচ্ছি আমরা কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংক পরিবার।কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংকের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা জেনিয়া সোলতানার সাথে কথা হয় সে জানান, নানী অসুস্থ থাকায় তাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেলাম হাসপাতালে, তখন দেখি একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীকে রক্ত দেওয়ার জন্য কিছু তরুণ আসল এবং তাদের মধ্যে একজন রক্ত দিল। তারা যখন চলে গেল এর পরে রোগীর বাবার থেকে জিজ্ঞেস করলাম যারা রক্ত দিতে এসেছে তারা কি আপনার আত্মীয়?

তিনি বলেন না, ওরা হচ্ছে কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংকের সদস্য। এর পর আমি নানীকে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়িতে নিয়ে এলাম। কিছুদিন পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পেলাম “কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংক” এর কার্যক্রম। এই সংগঠনের কার্যক্রমগুলো আমার ভালো লাগলো। তাই উক্ত সংগঠনের সভাপতির সাথে যোগাযোগ করে আমি তাদের সাথে কাজ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করি। তাদের সাথে কাজ করে আমি নিজেও রক্তদান করতে উৎসাহিত হয়েছি। এই পর্যন্ত আমি ৫ বার রক্তদান করেছি। কিল্লার আন্দর ব্লাড ব্যাংক সম্পর্কে লোহাগাড়া উপজেলা প.প. কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ হানিফ বলেন, স্বেচ্ছায় রক্তদান একটি ভাল কাজ, এ ধরনের উদ্যোগকে আমি সব সময় স্বাগত জানাই এবং সব সময় তাদের পাশে থাকব।

বর্তমানে উক্ত সংগঠনটি শুধু লোহাগাড়া নয় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান জেলাসহ পুরো চট্টগ্রাম বিভাগ জুড়ে রক্তদান করে আসছে । রক্তদানের পাশাপাশি তারা গরীব শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ, বৃক্ষ রোপন, জনসচেতনতামূলক কাজসহ আরো ব্যাপক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। উক্ত সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক/স্বেচ্ছাসেবিকাদের উৎসাহ যোগাতে প্রতি মাসে ১টি করে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। তারা তাদের এই কর্মকান্ড ছড়িয়ে দিতে চায় সর্বত্র। সংগঠনের সকল সদস্য জানান তাদের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য একটাই, অসহায় রোগী ও হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। রক্তের অভাবে যেন কোন রোগী কষ্ট না পায়। আর মানবতার কল্যাণে কাজ করতে পারলেই তাদের আনন্দ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments