ওষুধের মেয়াদ নিয়ে অন্ধকারে সাধারণ মানুষ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

অধিকাংশ ক্রেতা জানতে পারেন না তাদের কেনা ওষুধের মেয়াদ আছে কি নেই। একমাত্র বিক্রেতার উপর ভরসা রেখে তা কিনতে হচ্ছে। এ সুযোগে অতি মুনাফাখোর কিছু ওষুধ ব্যবসায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রয় করছেন। এ কাজে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের যোগসাজশও আছে। বেশির ভাগ বিক্রেতারও ওষুধ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব রয়েছে।

রোববার (২৩ জুন) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ২৫টি ফার্মেসিতে কথা বলে দৈনিক জাগরণ এসব তথ্য জানতে পারে।

মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বর এলাকায় অবস্থিত রহিম ফার্মেসি। সকালে সেখানে প্রবেশ করা মাত্রই জব্বার নামের এক ক্রেতা প্রেসক্রিপশন নিয়ে প্রবেশ করেন। ব্যথানাশক ও ভিটামিনসহ ৫ পদের ওষুধ কেনেন তিনি। মেয়াদ দেখে ক্রয় করেছেন কি না- এমন প্রশ্ন করা হলে বলেন- বোতলজাত ওষুধ ও ইনজেকশন হলে সেসব মেয়াদ দেখে কিনি। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের ট্যাবলেট, এন্টিবায়োটিক ক্যাপসুল কেনার সময় (পাতা ছাড়া) মেয়াদ দেখা হয় না। দেখার সুযোগও কম। বোতলজাত ওষুধের গায়ে যেভাবে মেয়াদ উল্লেখ করা থাকে, সেভাবে ট্যাবলেটের গায়ে থাকে না।

বনানীতে অবস্থিত মডেল ফার্মেসি ‘নিউ বনানী ফার্মেসি’র ফার্মাসিস্ট সোহেল সরকার দৈনিক জাগরণকে বলেন, ট্যাবলেট-ক্যাপসুলের পাতায় মেয়াদ থাকে। পুরো পাতা জুড়ে মাত্র এক জায়গায় খোদাই করে লেখা থাকে। মেয়াদ থাকা অংশ আমরা রেখে বিক্রি করি, যেন এই পাতা থেকে ওষুধ অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রি করার সময় মেয়াদ দেখাতে পারি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সীতেশ চন্দ্র বাছার দৈনিক জাগরণকে বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রয় বন্ধে প্রথম দায়িত্ব ফার্মেসির। একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর পুরো ফার্মেসি চেক করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশের ফার্মেসি পরিচালনাকারীরা এ কাজের জন্য উপযুক্ত নন, এ বিষয়ে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা নেই, নেই কোনো উপযুক্ত প্রশিক্ষণও। এ যেন বাদরের কাঁধে বন্দুক রাখা। এর জের টানতে হয় ক্রেতাদের। কিন্তু বিষয়টা এত সহজ নয়। এর সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি জড়িত।

তিনি বলেন, ওষুধের মেয়াদ আছে কি নেই, এর জন্য ক্রেতাদের পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় বিক্রেতাদের উপর। এটাই নিয়ম। কিন্তু এক শ্রেণীর অসাধু ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ অপকৌশলে বিক্রি করেন।

মিরপুর ৬০ ফিট সড়কের মোল্লার মোড় এলাকায় সোনা ফার্মেসিতে রোববার দুপুরে যায় দৈনিক জাগরণ। বিক্রেতা সুজনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, মেয়াদ চলে গেলে তারা ওষুধ কী করেন?

জবাবে সুজন বলেন, আমি কিছু বলতে পারব না। দোকানের মালিক ঢাকার বাইরে।

তাহলে আপনি কী করেন- প্রশ্নে বলেন, আমি তার ভাগনে। তিনি না থাকায় ওষুধ আমি বিক্রি করি।

ফার্মেসি বিষয়ে আপনার পড়াশোনা কী- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, এ নিয়ে আমার পড়াশোনা নেই। কাস্টমার প্রেসক্রিপশন আনেন, দেখে বিক্রি করি।

সোনা ফার্মেসির যে অবস্থা, একই অবস্থা ঢাকার অধিকাংশ ফার্মেসির। ব্যবস্থাপনাগত দিক থেকে ফার্মেসিগুলো দক্ষ নয়। কোনোমতে ওষুধ বিক্রিই তাদের উদ্দেশ্য। মেয়াদ আছে কি নেই, এ বিষয়ে তারা দায়িত্বশীল নন বলে অভিযোগ আছে। তবে ফার্মেসি মালিকদের অভিযোগ ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও।

ধানমণ্ডি এলাকার নূর ফার্মেসির মালিক সোহানুর রহমান দৈনিক জাগরণকে বলেন, ওষুধের মেয়াদ শেষ হলে কোম্পানিকে জানাই। যদি পরিমাণে অল্প হয়, তাহলে কোম্পানি নিতে চায় না। বলে দেয়- এত অল্প ওষুধ তারা নেবেন না, আরও জমতে হবে। সেক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জমানো খুবই দুঃসাধ্য।

বনানীতে অবস্থিত মডেল ফার্মেসি ‘নিউ বনানী ফার্মেসি’র কর্মী আল আমিন দৈনিক জাগরণকে বলেন, দেখা যায়, বছরে একটি ফার্মেসির ১০ বা ১২ শতাংশ ওষুধের মেয়াদোত্তীর্ণ হতে পারে। এটা খুবই অল্প ওষুধ, কোম্পানি নিতে চায় না। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জমলে কোম্পানিকে দেয়ার পর সমপরিমাণ অর্থের ওষুধ পাওয়া যায় না। এটা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি।

এই ক্ষতি এড়াতে কোনো কোনো অসাধু ফার্মেসি ব্যবসায়ী অপকৌশলে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ইচ্ছাকৃতভাবে বিক্রি করে থাকতে পারেন বলে আল আমিনের ধারণা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সীতেশ চন্দ্র বাছার বলেন, এ বিষয়ে ওষুধ কোম্পানিগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখা জরুরি, যেন ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

তিনি বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রয় বন্ধে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এই যে মডেল ফার্মেসি প্রবর্তন করা হলো, তা সরকারের অত্যন্ত উঁচুস্তরের পরিকল্পনার প্রতিফলন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box