এরশাদের সফলতা এবং বিতর্কের নানা দিক

আলোকিত সকাল ডেস্ক

চলে গেলেন বাংলাদেশের উন্নয়নের কারিগর কিংবদন্তি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। রোববার (১৪ জুলাই) সকাল পৌনে ৮টায় ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন তিনি। দীর্ঘ ৯ বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান থাকাকালে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তার নেয়া কার্যক্রম ও সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ইতিহাসে।

এরশাদ যেখানে পা রেখেছেন সেখানে বিজয়ের চিহ্ন একেছেন। জীবনে সোনালী রাজনীতির ভাজে ভাজে সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে গ্রাম বাংলার মানুষের ভালোবাসা। বাংলা ও বাঙালিকে তিনি প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। তাই বাংলার মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পল্লীবন্ধু।

কারণ তিনি বাংলাদেশের প্রত্তর অঞ্চলে ঘুরে বেরিয়েছেন। বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্র প্রধান মানুষের এত কাছে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দক্ষ ও সফল রাষ্ট্রনায়কের সম্মানে অভিহিত করা হয় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে। তিনি আধুনিক বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনানায়ক থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েই তিনি বললেন, ৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। বাংলার মানুষ তাই তাকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে উপাধী দিয়েছে পল্লীবন্ধু।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বরারই একটি আলোচিত এবং বিতর্কিত নাম। নয় বছর এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালীন যেসব কাজ করেছেন সেগুলো প্রভাব নানাভাবে পড়েছে পরবর্তী সময়ে।

ক্ষমতায় থাকার সময় এরশাদের কোন কাজগুলো আলোচনা এবং বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সেগুলো তুলে ধরা হলো-

উপজেলা পদ্ধতি চালু: জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সরকারী সুবিধাদি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এ ব্যবস্থা নেয়া। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে উপজেলা পরিচালনার পদ্ধতি চালু করা হয়।

হাইকোর্টের বেঞ্চ বিকেন্দ্রীকরণ: হাইকোর্টের ছয়টি বেঞ্চ ঢাকার বাইরে স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। উচ্চ আদালতের বিচারের জন্য যাতে ঢাকায় আসতে না হয় সেজন্যই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু আইনজীবীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি এরশাদ সরকার।

ঔষধ নীতি প্রণয়ন: ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকার দেশ একটি ঔষধ নীতি প্রণয়ন করে। এর ফলে ঔষধের দাম যেমন কমে আসে, তেমনি স্থানীয় কোম্পানিগুলো ঔষধ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করে।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম: জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি নিয়ে যেসব কাজ করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা।

সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার: ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য জেনারেল এরশাদ সামরিক গোয়েন্দাদের ব্যবহার করেন। এ অভিযোগ ছিল বেশ জোরালো। এছাড়া সামরিক বাহিনীর সহায়তা নিয়ে তিনি ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে দুটি বিতর্কিত নির্বাচন করেন। অভিযোগ রয়েছে, সেনাবাহিনীর সদস্যদের তুষ্ট রাখার জন্য সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়োগ ব্যাপকতা লাভ করে জেনারেল এরশাদের শাসনামলে।

দুর্নীতির বিস্তার: ক্ষমতায় থাকাকালীন এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জেনারেল এরশাদের দুর্নীতি নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। ১৯৮৬ সালে ব্রিটেনের দ্য অবজারভার পত্রিকা এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

মরিয়ম মমতাজ নামে এক নারী নিজেকে এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করে দ্য অবজারভার পত্রিকাকে বলেন, জেনারেল এরশাদ আমেরিকা এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার পাচার করেছেন।

এছাড়া বিভিন্ন সময় এসোসিয়েটেড প্রেস এবং ওয়াশিংটন পোস্ট সহ নানা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের শিরোনাম হয়েছিল। ক্ষমতাচ্যুত হবার পর দুর্নীতির মামলায় কারাগারেও থাকতে হয়েছে তাকে।

নির্বাচনে কখনো হারেননি এরশাদ: জেনারেল এরশাদের শাসনামল নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, ক্ষমতাচ্যুত হবার পরেও তিনি কখনো নির্বাচনের পরাজিত হননি। এমনকি কারাগারে থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন এরশাদ। যদিও এরশাদের নির্বাচনী এলাকাগুলো ছিল তাঁর গ্রামের বাড়ি রংপুর এবং আশপাশের জেলায়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments