এবার গণঐক্য চায় বিএনপি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দীর্ঘ সময় ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ড. কামাল হোসেন, সুলতান মনছুরদের বিএনপির সংসারে এনে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর এবার আরেকটি ঐক্যর আহ্বান বিএনপির। দলটির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ আহ্বান জানান। তিনি নতুন ঐক্যের নাম দিয়েছেন ‘গণঐক্য’!

খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, গণঐক্য ছাড়া এই স্বৈরাচার ফ্যাসিবাদ সরকারের কাছ থেকে জনগণকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। এখন ঐক্যবদ্ধ থেকে প্রয়োজন গণঐক্য। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দলে বিভক্তির চিন্তা, বিভাজনের চিন্তা না করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

তবে সাবেক মন্ত্রী ও আরেক সিনিয়র সদস্য মওদুদ আহমেদ বলেছেন, বিএনপির শীর্ষ নেতারা যদি ব্যর্থ হয় তাহলে তাদের সরিয়ে দিয়ে নতুন নেতৃত্বের ব্যবস্থা করা। গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপি আয়োজিত দলটির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৩৮তম শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছেন, আমাদেরকে আপনারা নেতা বলেন আর যাই বলেন, আমরা যদি ব্যর্থ হয়েও থাকি আর ব্যর্থ না হয়েও থাকি; আর ব্যর্থ হয়ে থাকলে আমাদেরকে সরিয়ে নতুন নেতৃত্বের ব্যবস্থা করুন।

কিন্তু দলটাকে শক্তিশালী রাখতে হবে। নির্বাচনের পর দলের ভূমিকার কথা স্মরণ করে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের পরবর্তীতে দলীয়ভাবে আমরা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম এবং সংসদকে অবৈধ ঘোষণা করে ছিলাম।

সে জন্য আমরা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিনি। আর যারা অংশগ্রহণ করেছিল প্রায় ২০০ জন তাদেরকে আমরা বহিষ্কার করেছি। গত নির্বাচনে আমাদের শত শত নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, জেল খেটেছেন এমনকি অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন।

কিন্তু সংসদে যোগদান করার কারণে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি বিরাট ক্ষোভ এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির সংসদে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেছেন, যে সংসদকে আমরা প্রত্যাখ্যান করলাম, যে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করলাম, যে সংসদকে অবৈধ বললাম সেই সংসদে আমাদের যোগ দেয়ার কারণে দলের অনেক নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিভ্রান্তি দূর করতে হবে। এই ধরনের ক্ষোভ থাকা ভালো না। এই ক্ষোভ যদি আমরা দূর করতে না পারি তাহলে জাতীয়ভাবে আমাদের রাজনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে পারব না।

মওদুদ আহমেদ বলেন, আমরা যদি জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতি সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে, পরিচালনা করতে না পারি, তাহলে আমরা শহিদ জিয়াউর রহমানের এই দলকে সুসংগঠিত করতে পারব না। এখন বিএনপির জন্য এক বিরাট সঙ্কটকাল। আমাদের নেত্রী অসুস্থ এবং কারাগারে।

তিনি বলেন, আজকে নয়, কালকে বেগম জিয়ার মুক্তি হবে এবং তিনি আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। কিন্তু তিনি এই মুহূর্তে কারাবন্দি, তিনি আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না, আমরাও তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না।

তিনি (খালেদা জিয়া) আমাদের নেতৃত্ব দিতে পারছেন না। আমাদের নেতা, দলেল ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (তারেক রহমান) প্রায় আট হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছেন। আর দেশে চলছে একদলীয়, নিষ্ঠুর, স্বৈরাচারী শাসন।

তাই এখন সর্বত্রজুড়ে প্রয়োজন ঐক্য বজায় রাখা। তিনি বলেন, সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে বিএনপির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে দিতে হবে এই প্রশ্নের উত্তর যদি আমরা দিতে পারি তাহলে শহীদ জিয়ার দলকে আমরা সুসংগঠিত করতে পারব।

বিএনপির নীতিনির্ধারক বলেন, আমি মনে করি অবিলম্বে আমাদেরকে একটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহষ করে হবে। এই ভেদাভেদ, ক্ষোভ দূর করার জন্য সকল অঙ্গ সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল, যুবদল স্বেচ্ছাসেবক দলসহ জাতীয় নির্বাহী কমিটি ডেকে আলোচনার মাধ্যমে আমাদের ভুল বুঝাবুঝি দূর করা।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, বিএনপিকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানের একটা বাণী ছিল দেশের স্বার্থে ইস্পাত কঠিন গণঐক্য সৃষ্টি করা।

ইস্পাত কঠিন গণঐক্য ছাড়া এই স্বৈরাচার ফ্যাসিবাদ সরকারের কাছ থেকে জনগণকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। এ জন্য আমরা যার যার অবস্থান থেকে সক্রিয় থাকব।

গণঐক্য সৃষ্টি করব। মোশাররফ বলেন, গঠনতন্ত্র মোতাবেক দলকে সুসংগঠিত করতে হবে। জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠন পরিচালনা করতে হবে। ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা যদি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলকে সুসংগঠিত করি, বিএনপির আদর্শ ও দর্শনকে তরুণ প্রজন্মের কাছে, প্রকৃতপক্ষে তাদের উপলব্ধিতে ঢুকিয়ে দিতে পারি, তবে আমাদের পক্ষে অনেক কিছুই সম্ভব।

দেশের এই মহাসঙ্কটকালে নিজেদের মধ্যে কোনো ধরনের বিভক্তি কিংবা বিভাজনের চিন্তা না করে সকল স্তরের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

দলের নেতাকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে অনেকে হত্যাশার কথা বলেন। আমি হত্যাশার কথা বলি না, বলতে চাই না, বিশ্বাসও করি না। আমি মনে করি, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যে দর্শন, যে চিন্তা, তা কখনো ব্যর্থ হওয়ার নয়।

বেগম খালেদা জিয়ার যে আর্দশ, যে ত্যাগ স্বীকার কখনো ব্যর্থ হওয়ার নয়। তিনি আরও বলেন, আজকের এই শাহাদাৎবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আমাদের শপথ গ্রহণ করতে হবে যে, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকব। আমরা কোনো বিভক্তির চিন্তা করব না, আমরা কোনো বিভাজনের চিন্তা করব না।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে মির্জা ফখরুল বলেন, আসুন আমরা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য এবং বিএনপিকে একটি সত্যিকার অর্থেই জনগণের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগঠন হিসেবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শপথ গ্রহণ করি।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

এ ছাড়া আরও বক্তব্য দেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, দলটির ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আজম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুল লতিফ, যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোরতাজুল করিম বাদরু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সভাপতি গোলাম সারওয়ার প্রমুখ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments