এখনো সন্ধান মেলেনি ডা. দম্পতির

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীর খিলগাঁও এলাকা থেকে সপরিবারে নিখোঁজ ডাক্তার দম্পতির সন্ধান এখনো করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আর নিখোঁজদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, এ ঘটনার পর আমরা রামপুরা থানায় জিডি করেছি। তাদের বিষয়ে কোনো প্রকার তথ্য থাকলে একমাত্র পুলিশের কাছে থাকতে পারে।

রাজধানীর চাঞ্চল্যকর গুলশানের হলিআর্টিজানে জঙ্গি হামলা ও শোলাকিয়ার ঈদের জামাতের হামলার পর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘরছাড়া তরুণদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ হয়। ওইসব নিখোঁজ ঘরছাড়া যুবকদের বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে দেশের গোয়েন্দা।

আর তখনই ঢাকা শিশু হাসপাতালের এক চিকিৎসকের পুরো পরিবারসহ দেশ থেকে উধাও হওয়ার তথ্য ফাঁস হয়। নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন— ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু চিকিৎসক খন্দকার রোকনুদ্দীন (৫০) তার স্ত্রী নাইমা আক্তার (৪৫), তাদের দুই মেয়ে রেজওয়ানা রোকন (২৩) ও রামিতা রোকন (১৫), জামাতা সাদ কায়েস (৩০)। এই পুরো পরিবার বাংলাদেশ থেকে গোপনে পালিয়ে সিরিয়া হয়ে আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পাড়ি জমিয়েছেন বলে পরিবারের ধারণা।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক রোকনুদ্দীন খিলগাঁও চৌধুরী পাড়ার ব্লি-ব্লকের ৪১১ নম্বর নিজ বাড়িতে থাকতেন। তার স্ত্রী নাইমা ঢাকার বাইরের একটি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন।

গত ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়। পরিবারের সদস্যদের ধারণা তারা এখন সিরিয়াতেই আছেন। সিরিয়া ও ইরাকের একটি অংশজুড়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে কাজ করছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থেকে জঙ্গি হামলায় আইএসের নাম সামনে রয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলাকারী হিসেবে ঘরছাড়া পাঁচ তরুণ ও যুবকের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ হয়। এরপর দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিখোঁজ আরও ১০ যুবকের তথ্য প্রকাশ করা হয়। শুধু তাই নয়, তাদের সন্ধানের জন্য পুরস্কার ঘোষণাও করা হয়।

আর তাদের ছবিসহ সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করা হয়। এরপর আরও নিখোঁজ আরও সাতজনের তথ্য পাওয়া যায়। তাদের পাঁচজনই হলেন ঢাকা শিশু হাসপাতালে তৎকালীন রেজিস্টার ডা. রোকনুদ্দীন ও তার পরিবারের ৪ সদস্য। আর অপর দুজন হলেন তাওসিফ হোসেন এবং সেজাদ রউফ ওরফে অর্ক ওরফে মরক্কো।

গতকাল খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার ব্লি ব্লকের ৪১১ নম্বর বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকতেন রোকনুদ্দীন। বাড়িটি তার শ্বশুর খ্যাতিমান হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক প্রয়াত আলী আহমেদের। ওই বাড়ির মালিক ডা. আলী আহমেদ মারা যাওয়ার পর তার দুই মেয়েকে বাড়িটি দিয়ে গিয়েছিলেন। তার একজন রোকনুদ্দীনের স্ত্রী নাইমা বলে জানা গেছে।

বাড়ির নিচতলায় ওষুধের দোকানদার জানান, তিনি গত ২০১২ সাল থেকে সেখানে ভাড়া থাকছেন। ডা. রোকনুদ্দীনের পরিবারের কোনো সন্ধান কেউ বলতে পারে না। তার স্ত্রীর বোন ডা. হালিমা পাশের ফ্ল্যাটে আলী আহমেদ হোমিওপ্যাথিক সেন্টারে রোগী দেখেন। হয়তো তিনিই কিছু বলতে পারেন। অথবা মিরপুর ডিওএইচএস এর ডা. রোকনুদ্দীনের ভাই থাকেন তিনি বলতে পারেন। পরে ডাক্তার হালিমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ ঘটনায় আমরা রামপুরা থানায় একটি জিডি করেছি।

আমাদের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ করেনি। রামপুরা থানা পুলিশ আমাদেরকে বলেছে, যদি কেউ কোনো প্রকার তথ্য জানতে আসে, তাহলে যেন থানায় যোগাযোগ করতে বলেন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনৈক ব্যক্তি জানান, ডাক্তার রোকনুদ্দীন দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে তার এক আত্মীয়কে বলেছেন, তারা প্রথমে মালয়েশিয়া যাবে, এরপর অন্য কোনো মুসলিম দেশে গিয়ে অবস্থান করবেন।

আরেক সূত্র জানায়, ডা. রোকনুদ্দীনের বড় মেয়ে রেজওয়ানা ও তার স্বামী নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। তবে তিনি লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি। আর তার ছোট মেয়ে রামিতা ভিকারুন নিসা নূন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। গুলশান ও শোলাকিয়ায় নিহত দুই হামলাকারী নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তাদের মদদ দেয়ার অভিযোগে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপ-উপাচার্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিখোঁজদের মধ্যেও বেসরকারি এই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী ছিলেন।

স্থানীয়রা জানান, ডাক্তার রোকনু্দ্দীনের মেয়ে নাইমা রোকন পরহেজগার ছিলেন। তবে তার দুই মেয়ে কয়েক বছর আগে থেকে হিজাব পরা শুরু করেছিলেন। পাঁচ তলা ভবনটি ভাগাভাগি করে নেন নাইমা ও তার বোন হালিমা।

নিচতলার আলী আহমেদ ফার্মেসিতে রোগীও দেখেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হালিমা। তবে হালিমা ওই এলাকায় থাকলেও পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ওই বাড়িতে থাকতেন না। তবে বাড়িটির গেটে একটি নোটিস টাঙানো রয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে নিম্ন আদালতে মামলা বিচারাধীন।

অপর এক সূত্র জানায়, ডাক্তার রোকনুদ্দীন দেশ ছাড়ার পর পরিবারকে ফোন করে তারা বলেছিলেন, আমরা একটি মুসলিম দেশে অবস্থান করছি। আমরা আর কোনোদিন বাংলাদেশে ফিরব না। তোমরা আমাদের যা আছে তা ভাগ-বাটোয়ারা করে বুঝে নাও।

ডাক্তার রোকনুদ্দীনের স্ত্রী নাইমা সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যশোর সরকারি এম এম কলেজে শিক্ষকতা করতেন। গত ২০১৫ সালের ১৩ জুলাই ফ্রান্স, জার্মানি ও মালয়েশিয়া যাবেন বলে ৪৬ দিনের ছুটি নিয়েছিলেন।

কিন্তু তার ছুটি শেষ হলেও কর্মক্ষেত্রে আর যোগদান করেননি। গুলশানের হলিআর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর নিখোঁজ তরুণ-যুবকদের তথ্য পাওয়া গেলেও ডাক্তার রোকনুদ্দীনের পুরো পরিবার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার রহস্য এখনো রহস্যই রয়েছে গেছে।

এ ব্যাপারে রামপুরা থানায় যোগাযোগ করা হলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমার সংবাদকে প্রথমে বলেন, ঘটনাটি খিলগাঁও থানায় হবে। তাই সেখানে যোগাযোগ করুন। এরপর বলেন, আমি এই থানায় নতুন বিধায় বিষয়টি আমার জানা নেই।

আস/এসআইসু

Facebook Comments