একপথ বন্ধ হলে খুলছে ৩ পথ!

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সিলেটের জকিগঞ্জ, পটুয়াখালী ও বরগুনা- নতুন এই তিন রুটে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ায় চোরাকারবারি সিন্ডিকেট এখন ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদীয়ার করিডর ধরে ইয়াবা পাচার করছে। আগে যারা মূলত গরু এবং অস্ত্র পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারাও এখন ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া হেলিকপ্টারকে ইয়াবা পাচারের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে বলে গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল
একপথ বন্ধ হলে খুলছে ৩ পথ!

মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার রোধের্ যাব-পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বিজিবি ও কোস্টগার্ডের চলমান সাঁড়াশি অভিযানের মুখে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মাদক পাচারকারীদের মৃতু্যর মিছিল দ্রম্নত দীর্ঘ হলেও এ সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা এখনো থামেনি। বরং প্রশাসনকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে মাদক পাচারের একটি রুট বন্ধ হতে না হতেই চোরাকারবারিরা নতুন আরও তিন পথ খুঁজে নিচ্ছে। ফলে মাদক পাচার রোধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের পরও অবৈধ মাদকের অবাধ বাণিজ্য আগের মতোই চলছে। উদ্বেগজনক এ পরিস্থিতির মাঝেই গোটা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আজ বুধবার সারাদেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মানববন্ধন,র্ যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের মাদক পাচারের বিভিন্ন রুটে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের দুর্বল নজরদারি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পাচারকারীদের গোপন আঁতাত এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বেশকিছু প্রভাবশালী নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতার কারণে মাদকবিরোধী অভিযান সফল হচ্ছে না। এর ওপর টেকনাফে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সরাসরি মাদক পাচার ও তা বেচাকেনায় শক্তভাবে জড়িয়ে পড়ায় মাদক বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরা সত্যিকার অর্থেই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া মাদকাসক্তি নিরাময়ে সরকারের যথাযথ উদ্যোগ না থাকায় মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার সমান তালে বাড়ছে বলে মনে করেন অপরাধ পর্যবেক্ষকরা।

এদিকে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান ব্যর্থ হওয়ার কথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মানতে না চাইলেও এ অপতৎপরতা যে এখনো বন্ধ করা যায়নি খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন। গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিক কারণে মাদক সমস্যায় পড়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত-মিয়ানমার থেকে দেশে অবৈধ মাদক আসছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আলোচিত মাদক ইয়াবা আসছে মিয়ানমার থেকে। আর ভারত থেকে আসছে গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইনজেক্টিং ড্রাগ।’

গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ইয়াবাসহ মাদক পাচারকারী গডফাদাররা এখন কৌশল পাল্টিয়ে তাদের অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অনেকে এখন মাদক বহন কাজে শিশু-কিশোর ও নারীদের ব্যবহার করছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা তরুণীদের এই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা মাদক বাণিজ্যে হিস্যা নেয়ায় সরকারের কৌশলী নানা উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।

এদিকে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের একটা অংশের আত্মসমর্পণের ঘটনাকে সরকার বড় সাফল্য হিসেবে জাহির করলেও টেকনাফ-কক্সবাজার ও এর আশপাশের জনপ্রতিনিধিরা এ ঘটনাকে ভিন্নভাবে দেখছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক জনপ্রতিনিধি বলেন, সাবেক সাংসদ বদির তিন ভাইসহ ১০২ জন মাদকব্যবসায়ীর আত্মসমর্পণের ঘটনা পুরোটাই ইয়াবা কারবারিদের নতুন ষড়যন্ত্র। এ অপকৌশলে গডফাদাররা নিশ্চিন্তে সেফ হাউজে (কারাগার) থেকে তাদের ব্যবসা আগের মতোই চালিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, গডফাদাররা আত্মসমর্পণের আগে দীর্ঘসময় নিয়ে তাদের মাদক বাণিজ্যের ছক নতুন করে এঁটেছে। তারা তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে ইয়াবা পাচার, বিভিন্ন স্থানে তা সরবরাহ এবং এ বাণিজ্যে অর্জিত অর্থ দ্বিতীয় চালানে বিনিয়োগের দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছে। এদের কেউ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে সেকেন্ড ম্যান হিসেবে কে দায়িত্ব পালন করবে তা-ও ঠিক করা আছে। আর এ কারণেই গডফাদাররা কারা অন্তরীণ থাকার পরও মাদকবাণিজ্যে কোনো ভাটা পড়েনি।

যদিও কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনের দাবি, তাদের পদক্ষেপের কারণে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসা অনেক কমেছে। যারা আত্মসমর্পণ করেছে ওই ১০২ জন ছিল বড় মাপের ব্যবসায়ী। তবে তাদের বাইরে আরও অনেক গডফাদার রয়ে গেছে। এদের তথ্য আগে পুলিশের কাছে ছিল না। আত্মসমর্পণ করা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তাদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। এর প্রেক্ষিতে নতুন করে আরও বেশ কয়েকজন ইয়াবা পাচারকারী ও হুন্ডি ব্যবসায়ীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের ধরপাকড়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। মাদক পাচার অচিরেই ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করেন মাসুদ হোসেন।

তবে পুলিশ সুপারের এ দাবির সঙ্গে সহমত পোষণে নারাজ টেকনাফ-কক্সবাজার ও উখিয়ার স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের ভাষ্য, মাদক পাচার রোধের্ যাব-পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতায় হয়তো ঘাটতি নেই। তবে এ ব্যাপারে তাদের কৌশলগত যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। ইয়াবা পাচারের মূল রুট চিহ্নিত করে সে পথে কঠোর নজরদারি চালিয়ে পাচারকারীদের ধরার ফাঁদ পাতার আগেই তারা নতুন একাধিক রুট খুঁজে নিচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

বিষয়টি স্বীকার করে সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচারের নিরাপদ রুট ছিল বাংলাদেশের চট্টগ্রামের কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া প্রভৃতি এলাকা। তবে মাদকবিরোধী সর্বাত্মক অভিযানে দুই শতাধিক ‘মাদক ব্যবসায়ী’ নিহত হওয়ার পর রুট বদলে ফেলেছে চোরাকারবারিরা। ইয়াবা পাচারের নতুন পথ হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্তকে। বিজিবি, পুলিশের কড়া নজরদারি সত্ত্বেও সীমান্তবর্তী এ উপজেলা দিয়ে এখন বানের জলের মতো ঢুকছে ইয়াবা।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে মিয়ানমার থেকে ভারতের মণিপুর, ইম্ফল ও শিলচর হয়ে ইয়াবার চালান আসে দেশটির করিমগঞ্জে। করিমগঞ্জ হচ্ছে জকিগঞ্জ উপজেলার ঠিক উল্টো দিকে ভারতের অংশ। করিমগঞ্জ থেকেই জকিগঞ্জ উপজেলার খলাছড়া ইউনিয়নের লোহারমহল, সুলতানপুর ইউনিয়নের অজরগাঁও, ইছাপুর, সুলতানপুর, সহিদাবাদ ও ভক্তিপুর, বারঠাকুরী ইউনিয়নের লাড়িগ্রাম ও ছালেহপুর, জকিগঞ্জ ইউনিয়নের সেনাপতির চক, মানিকপুর ও ছবড়িয়া, কসকনকপুর ইউনিয়নের বলরামেরচক এলাকা দিয়ে ইয়াবা ঢুকছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে ইয়াবা পাচারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় লোহারমহল সীমান্ত এলাকা।

এদিকে বেশ কয়েক মাস ধরে টেকনাফ থেকে পটুয়াখালী, বরগুনাসহ বিভিন্ন জেলায় নৌপথ ব্যবহার করে ইয়াবার বড় চালান নিয়ে ঢাকায় আসতে শুরু করেছে চোরাকারবারিরা। গত ২ এপ্রিল সাড়ে ৮ লাখ পিস ইয়াবাসহ তিন পাচারকারীর্ যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর এ তথ্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে গোয়েন্দারা।

তবে ভারতীয় নার্কোটিক কন্ট্রোল বু্যরো (এনসিবি)-র গোয়েন্দাদের দাবি, মিয়ানমার থেকে মিজোরাম হয়ে সিলেটের জকিগঞ্জ এবং পটুয়াখালী ও কুয়াকাটা হয়ে নদীপথে ঢাকায় ইয়াবা পাচারের রুটও এখন পাচারকারীদের কাছে পুরানো হয়ে গেছে। এসব পথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ায় তারা এখন নতুন আরও তিনটি রুট ব্যবহার করছে। এর মধ্যে একটি সিন্ডিকেট মিয়ানমার থেকে মণিপুর-মিজোরাম হয়ে সড়ক পথে লাখ লাখ পিস ইয়াবা ভারতে নিয়ে যাচ্ছে। তা কলকাতা এবং সংলগ্ন উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় জমা করে রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্যারিয়াররা সেখান থেকে তা সংগ্রহ করে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছে।

সম্প্রতি কলকাতার বেনিয়াপুকুর থেকে কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) এ সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করার পর এ তথ্য উদ্ঘাটিত হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের দাবি, এখন উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদীয়ার গরু পাচারের করিডোর ধরেই প্রতিদিন পাচার হচ্ছে লাখ লাখ টাকার ইয়াবা। উত্তর ২৪ পরগনার ঘোজাডাঙা, পেট্রাপোল, ঝাউডাঙা এবং নদীয়া জেলার একাধিক সীমান্তবর্তী গ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে ইয়াবা। আগে যারা মূলত গরু এবং অস্ত্র পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারাই এখন ইয়াবা পাচার করছে বলের্ যাবকে জানিয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দারা।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বেসরকারি হেলিকপ্টারকে ইয়াবা পাচারের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে বলে তারা খবর পেয়েছে। কক্সবাজার থেকে হেলিকপ্টারে করে মাদক চোরাচালানের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য দিয়েছে। যেহেতু হেলিকপ্টারের যাত্রীদের তেমন কোনো নিরাপত্তাবলয়ের মাধ্যমে যেতে হয় না এবং পণ্য পরিবহনের সময় স্ক্যানিংয়ের যথাযথ ব্যবস্থা নেই, তাই এতদিন ব্যাপারটি কারও নজরে আসেনি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box