উন্মুক্ত হল শিল্পে গ্যাস সংযোগ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

অবশেষে উন্মুক্ত হল শিল্প খাতে গ্যাস সংযোগ। দীর্ঘ ৮ বছর বন্ধ থাকার পর সরকার আবারও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ অবস্থায় শিল্পে গ্যাস সংযোগের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটি বাতিল করা হয়েছে।

এখন থেকে বিতরণ কোম্পানিগুলো তাদের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরাসরি সংযোগ দেবে। সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগ এক আদেশে দেশের সব বিতরণ গ্যাস কোম্পানিকে এই নির্দেশনা দিয়েছে। ফলে এখন শিল্পকারখানার জন্য যারা গ্যাস চাইবেন, তাদেরই সংযোগ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

সরকারি ওই আদেশে বলা হয়েছে, শিল্পে গ্যাস সংযোগের জন্য ২০১১ সালের ৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদবিষয়ক উপদেষ্টার নেতৃত্বে যে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তা বাতিল করা হল। এখন থেকে নিজ নিজ বিতরণ কোম্পানির পরিচালনা পর্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে।

এদিকে শিল্পে গ্যাস সংযোগ উন্মুক্ত করা হলেও আবাসিক, সিএনজি ও বাণিজ্যিকে নতুন করে আর কোনো গ্যাস সংযোগ দেবে না সরকার। একই সঙ্গে শিল্পমালিকদের গ্রিডের বিদ্যুতে অভ্যস্ত করতে ক্যাপটিভ সংযোগকে নিরুৎসাহিত করার কথাও বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই এ কমিটির বিষয়ে নানাদিক থেকে অভিযোগ আসছিল। আমি বলছি না, কমিটি কোনো দুর্নীতি করেছে। কিন্তু কমিটির গ্যাস সংযোগ দেয়ার ধীরগতির সুযোগ নিয়ে অনেকেই দুর্নীতি করেছে।’ তিনি বলেন, ‘এতে শিল্পকারখানার কাজ প্রায় থেমেই গিয়েছিল। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে শেষ পর্যন্ত বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, এই ধরনের কমিটির কারণে আমাদের বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, এতে কর্মসংস্থানও কমছে। তাই সংযোগ প্রক্রিয়া দ্রুত করা প্রয়োজন।’

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এখন থেকে শিল্পকারখানার জন্য যারা গ্যাস চাইবেন, তাদেরই দেয়া হবে। এই বছর না পারলে পরের বছর দেয়া হবে। কিন্তু কাউকে বসিয়ে রাখা হবে না। আর এতে দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না।’

জ্বালানি বিভাগের ওই আদেশে বলা হয়েছে, এখন থেকে নিজ নিজ কোম্পানির বোর্ড গ্যাসের প্রাপ্যতা অনুযায়ী শিল্পে নতুন সংযোগ দেবে। একই সঙ্গে তারা গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে লোডও বাড়াবে। তবে সেক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

আদেশে আরও বলা হয়, নতুন গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার কারখানাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বেড়ে যাওয়া এবং ক্যাপটিভ পাওয়ারে উৎপাদন দক্ষতা কম থাকায় ক্যাপটিভ শ্রেণীতে নতুন গ্যাস সংযোগে নিরুৎসাহিত করতে হবে। ভবিষ্যতে সিএনজি, গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক শ্রেণীতে নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়া আগের মতো স্থগিত রাখতে হবে। তবে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কারাগার এই নির্দেশনার বাইরে থাকবে। সব বিতরণ কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ কোম্পানির গ্যাসপ্রাপ্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লোড বৃদ্ধি এবং নতুন সংযোগের আবেদন নিষ্পত্তি করবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর গ্যাস সংযোগের উদ্দেশে পাইপলাইন স্থাপনসহ অন্য কার্যক্রম অগ্রাধিকার পাবে।

সূত্র জানায়, দীর্ঘ ৮ বছর ধরে জ্বলানি উপদেষ্টার নেতৃত্বে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে শিল্পে গ্যাস সংযোগ নিয়ন্ত্রিত ছিল। এতে গ্যাস সংযোগ প্রক্রিয়া ধীর হওয়ায় নতুন শিল্পকারখানা চালু হয়েছে খুবই কম। ফলে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। অনেক শিল্পমালিকের আবেদন জমে গিয়েছিল। তাদের বিনিয়োগও আটকে গিয়েছিল। এই কমিটির অনুমোদনপ্রাপ্ত ২ হাজারের বেশি শিল্পকারখানায় এখনও গ্যাস সংযোগ দেয়া সম্ভব হয়নি। এ কমিটির কাছে এখনও এক হাজারের বেশি আবেদন জমে আছে।

তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির এক কর্মকর্তা জানান, সরকার যা চাইবে, আমরা সেভাবেই কাজ করব। এর আগে সরকার আবাসিকে গ্যাস না দেয়ার জন্য মৌখিক আদেশ দিয়েছিল। কিন্তু লিখিত কোনো আদেশ কখনও দেয়নি। এবারই প্রথম লিখিত আদেশ এলো।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সরকার দেশে গ্যাস সংকটের কথা বলে আবাসিক সংযোগ বন্ধ করে দেয়। এরপর ২০১৩ সালের শেষদিকে ফের আবাসিক সংযোগ চালু করে। কিন্তু ওই নির্বাচনের পর আবার অলিখিতভাবে জ্বালানি বিভাগ থেকে বিতরণ কোম্পানিকে আবাসিকে নতুন আবেদন নিতে নিষেধ করে দেয়া হয়। তবে এবার লিখিতভাবে আবাসিকে সংযোগ বন্ধের নির্দেশ দেয়া হল।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিদিন ৬৫০ মিলিয়ন থেকে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। জুনের মধ্যে এটি ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হতে পারে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, শিল্পে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করেছে সরকার। সেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস সংযোগও নিশ্চিত করতে চায়। এবার এ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ হবে। এজন্য সরকার শিল্প খাতে গ্যাস সংযোগ স্বাভাবিক করতে চায়। তিনি বলেন, গ্যাস সংযোগ নিয়ে বিভিন্ন কমিটির কারণে নানা বাধা আসে। শিল্পমালিকরা নিরুৎসাহিত হন। দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। তাই আমি মনে করি, শিল্পে গ্যাস সংযোগ টোটালি উন্মুক্ত হয়ে যাক। সংযোগের জন্য একটি গাইডলাইন থাকবে। সে অনুযায়ী শিল্পমালিকরা আবেদন করবেন আর কানেকশন (সংযোগ) পেয়ে যাবেন।

শিল্পে গ্যাস সংযোগের বিষয়ে নতুন আদেশ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, গ্যাস সংযোগ উন্মুক্ত করার এমন উদ্যোগে আশাবাদী হবেন শিল্পমালিকরা। তাছাড়া সংযোগ নেয়ার জন্য উচ্চপর্যায়ের কোনো কমিটি থাকবে না, এটা সরকারের একটা বড় সিদ্ধান্ত।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতি-মাদকের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশকে বিনিয়োগের নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান। এজন্য কার্যকরভাবে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেবেন। দেশের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সমাজ এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে তাদের মতে, বিনিয়োগ খাতে তখনই গতি আসবে, যখন সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা তথা গ্যাস-বিদ্যুতের প্রয়োজনীয় চাহিদার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। এর বাইরে কোনো স্বপ্ন কিংবা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হওয়ার সুযোগ নেই।

তাদের মতে, অতীতের মতো আমলাতন্ত্রসহ প্রভাব বিস্তারকারী বিভিন্ন সেক্টরের ষড়যন্ত্রকারীরা এখনও পুরোমাত্রায় সক্রিয়। তাদের কারণে বিগত দুই মেয়াদে সুযোগ ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি। তাই এবার শুরুতেই খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই সজাগ ও সুদৃঢ় হতে হবে। তা না হলে ষড়যন্ত্রকারীদের রোষানলে পড়ে বিনিয়োগসহ দেশীয় শিল্প-কলকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আলোকিত সকাল/এসআইসু

Facebook Comments