উন্নয়ন কাজে নেই গতি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সরকার প্রতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপিতে বেশি করে বরাদ্দ দিলেও উন্নয়ন কাজে গতি পাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, ড. এম ওয়াজেদ মিয়ার নামে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলেও সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন অজুহাতে ওইসব প্রকল্প ঠিক সময়ে বাস্তবায়ন করছেন না।

পুলিশ, পিজিআর, সচিবদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পও বারবার সংশোধন করে চলতি অর্থবছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা আইসিইউতে থেকে যাচ্ছে। তাই ওইসব প্রকল্প প্রাণে বাঁচিয়ে রাখতে আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নামে মাত্র এক লাখ টাকা করে বরাদ্দ দিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

গতকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ-এনইসি সভায় আগামী অর্থবছরের এডিপি অনুমোদন দেয়ার সময় এরকম ৪৮টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়া আগামী অর্থবছরের জন্য এক হাজার ৫৬৪টি প্রকল্পে ২ লাখ ১৫ হাজার ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও চলতি অর্থবছরেই প্রকল্প রয়েছে এক হাজার ৪৩৪টি। নতুন প্রকল্প মাত্র ১৩০টি।

গত এপ্রিল পর্যন্ত এডিপির বাস্তবায়ন হয়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। বাকি দুই মাসে ৪৫ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে হবে। রাজধানীর শেরে-বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, শেখ রেহানা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন প্রকল্পটি ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুনে শেষ করার কথা। ৪ বছরেও তা হয়নি শেষ। মাঝে সংশোধন করে আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না।

আবার তা বাদও দেয়া যাচ্ছে না। তাই ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নামেমাত্র এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ড. এম ওয়াজেদ মিয়া টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, পীরগঞ্জ প্রকল্পেরও একই অবস্থা। ২০১৫ থেকে শুরু করে ২০১৮ সালে শেষ হওয়ার কথা।

তা না হওয়ায় এক বছর সময় বাড়িয়ে আগামী জুনে শেষ করার কথা। কিন্তু তাও হচ্ছে না। তাই এ প্রকল্পেও লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট প্রকল্পটি সংশোধন করে জুনে শেষ করার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। এ সময়ে গাড়িসহ অন্যান্য কাজের বিল পরিশোধ করা সম্ভব না। তাই লাখ টাকা দিয়ে নতুন এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনেকগুলো কারণে এসব প্রকল্পে নামমাত্র টাকা রাখা হয়েছে। প্রথমত, এ বছর জুনের মধ্যে প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করার কথা থাকলেও কিন্তু মন্ত্রণালয়গুলো তা করতে পারবে না।

দ্বিতীয়ত, অর্থ প্রাপ্যতা নেই। অর্থাৎ চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যে টাকা দেয়া হয়েছে ওই প্রকল্পের বিপরীতে, সেটিই খরচ করতে পারেনি। তাই আসছে বাজেটে এক লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।

যদি সমস্যা সমাধান করতে পারে, তাহলে সংশোধিত বাজেটে টাকা বাড়িয়ে দেয়া হবে। জমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং মামলা-মোকদ্দমার কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয় না। এতে বছরের পর বছর প্রকল্পের কাজ স্থবির থাকে। আবার কোনো কোনো প্রকল্প নেয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়।

এবারে জাতীয় ভোটের আগে অনেক প্রকল্প পাস করা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ওই সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা জটিলতা আসে। এ ব্যাপারে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, রাজনৈতিক কারণে বিশেষ করে ভোটের আগে অনেক প্রকল্প পাস হয়েছে।

কিন্তু বিভিন্ন কারণে বাস্তবায়নে দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাই কিছু প্রকল্প বাঁচাতে লাখ টাকা করে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। তবে আগামী অর্থবছরে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে প্রথম থেকেই তিনগুণ বেশি জোর দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

বিএডিসির বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থাদির আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন প্রকল্পেও লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি তিন বছরে শেষ না হওয়ায় সংশোধন করে জুনে শেষ করার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। মুন্সিগঞ্জ জেলা স্টেডিয়াম এবং সুইমিংপুলের অধিকতর উন্নয়নসহ ইনডোর স্টেডিয়াম ও টেনিস কোর্ট নির্মাণ প্রকল্পটিও জুনে শেষ হচ্ছে না।

তাই লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে টিকে রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশ বেতার শাহবাগ কমপ্লেক্স আগারগাঁও ঢাকায় স্থানান্তর, নির্মাণ ও আধুনিকায়ন জুনে শেষ হচ্ছে না। তাই লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। স্কিলস এন্ড ট্রেনিং ইনহেন্সমেন্ট প্রকল্পটি ৩০ এপ্রিল সংশোধন করে জুনে শেষ করার জন্য।

কিন্তু তা সম্ভব না হওয়ায় লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অবকাঠমো উন্নয়ন প্রকল্পটি সংশোদন করে জুনে শেষ করার কথা। তা না হওয়ায় ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ জন্য আগামী অর্থবছরে লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ্যাকসেস টু ইনফরমেশনটি ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০১৬ সালে শেষ করার কথা। কিন্তু ওই সময়ে সম্ভব না হওয়ায় কৃষি বাতায়নকে আরও তথ্য নির্ভর করতে জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। তারপরও সম্ভব না হওয়ায় লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, ঢাকার ইস্কাটনে সিনিয়র সচিব, সচিব ও গ্রেড-১ কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পটিও দীর্ঘ সময়ে বাস্তবায়ন করতে না পারায় সংশোধন করে জুনে শেষ করার কথা। তাও হচ্ছে না।

তাই লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে আগামী অর্থবছরে যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের ৫০টি হাইওয়ে পুলিশ আউট পোস্ট নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১০ সালে শুরু হয়ে চলছেই। সংশোধন করে জুনে শেষ করতে বলা হয়। তারপরও হচ্ছে না।

আবারো এক বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ জন্য লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পুলিশের ১০১টি জরাজীর্ণ থানা ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১২ সালে শুরু হয়ে সংশোধন করে জুনে শেষ করার কথা। তা না হওয়ায় আবারো লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এছাড়া পুলিশ বিভাগের ১৯টি অস্ত্রাগার নির্মাণ প্রকল্পের একই অবস্থা। ২০১৫ সালে শুরু হয়ে গত বছরে শেষ করতে না পারায় জুনে শেষ করার জন্য সময় বাড়ানো হয়। তারপরও হচ্ছে না। তাই লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিদ্যমান পুলিশ হাসপাতালগুলোর আধুনিকায়ন শেষ হচ্ছে না জুনে।

তাই লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কোস্টগার্ডের প্রকল্পটিও ২০১৫ সালে শুরু হয়ে সংশোধন করে জুনে শেষ করার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। তাই লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে বাঁচানো হচ্ছে।

এভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অসংখ্য প্রকল্প বাঁচিয়ে রাখতে গতকাল লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেয় সরকার। ঢাকা ও রংপুর আবহাওয়া রাডারের উন্নয়ন প্রকল্পটিও সংশোধন করে জুনে শেষ হচ্ছে না।

তাই বাঁচাবার জন্য লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ঢাকা সেনানিবাসে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট এর জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার্স ও অন্যান্য পদবীদের বাসস্থান নির্মাণ প্রকল্পেও লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কারণ প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments