উদ্ভট উটের পিঠে সাত কলেজ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত সাত কলেজের দুই লাখ শিক্ষার্থীর এখন চরম দশা। তারা না পারছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতে না পারছে ঢাবির সঙ্গে একাত্ম হতে। তাদের ভাগ্য এখন সওয়ার হয়েছে উদ্ভট উটের পিঠে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টেনে নিয়ে নিজেদের সঙ্গে আত্তীকরণের পর এখন তাদের ঠিকমতো দেখভাল করতে পারছে না ঢাবি কর্তৃপক্ষ। সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে শিক্ষার্থীদের দাবির দিকেও নজর দিচ্ছে না তারা। অপরদিকে এ নিয়ে কোনো ধরনের বিকার দেখা যাচ্ছে না সরকারি মহলেও।

২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ঢাবির অধিভুক্ত করার পর থেকে অব্যাহত সেশনজট, সময়মতো পরীক্ষা না হওয়া, রুটিন প্রকাশে সমন্বয়হীনতা, ফলাফলে অনিশ্চয়তাসহ ইত্যাদি অব্যবস্থাপনার কবলে পড়ে ৭ কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে তাদের শিক্ষাজীবন রীতিমতো অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দাবিতে তারা রাস্তায় নামছে। কিন্তু সমাধান মিলছে না। ইতোমধ্যে ৭ কলেজের জন্য স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, পাঠদান, সিলেবাস তৈরি, প্রশ্নপত্র তৈরিতে সমন্বয় সাধন, পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ত্রুটিমুক্ত ফলাফল প্রকাশ, প্রতি মাসে প্রত্যেক বিভাগে প্রতি কলেজে দুদিন করে মোট ১৪ দিন ঢাবির শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়া, এবং ক্রাশ প্রোগ্রাম চালুসহ বেশ কিছু দাবি উত্থাপন করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের তরফ থেকে। সে দাবি মেনে নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েও বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সর্বশেষ গত ৬ জুলাই ৭ কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করে ঢাবি ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান আশ্বাস দিয়েছেন সব সমস্যার সমাধান করা হবে। এজন্য তিনি কয়েক মাস সময়ও চেয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এ আশ্বাস প্রদানের কয়েকদিন যেতে না যেতেই সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিল এবং ওইসব কলেজকে ঢাবির সঙ্গে বেমানান দাবি করে রাস্তায় নেমেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

আজ (১৭ জুলাই) তারা রাজধানীর শাহবাগ অবরোধ করেছে। তারা বলেছে, ‘এই অধিভুক্তি আমাদের জন্য অভিশাপস্বরূপ। আমরা এই অভিশাপ থেকে মুক্তি চাই।’ একই সঙ্গে তারা এও বলেছে, ‘এই অভিশাপ সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের যেমন ভোগান্তিতে ফেলেছে, তেমনি আমরাও এর চরম মূল্য দিচ্ছি। শিক্ষকরা এমনিতেই আমাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তার ওপর সাত কলেজের এত শিক্ষার্থীকে কীভাবে সামাল দেবে।’

উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী সাতটি সরকারি কলেজ-ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত করা হয়। কিন্তু উচ্চশিক্ষার মান তো দূরের কথা, সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমই পরিচালনা করতে পারছে না ঢাবি। পর্যাপ্ত লোকবল, পরিকল্পনা এবং আন্তরিকতার অভাবে সাত কলেজের দায়িত্ব নিয়ে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে ঢাবি প্রশাসন।

এসব আশঙ্কা অনুমান করে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। তাদের আশঙ্কা ও অভিযোগকে আমলে না নিয়ে প্রথম থেকেই তাদের আন্দোলনে লাঠি, টিয়ারশেল, গুলি চালিয়েছে পুলিশ। রাস্তায় বেদম পেটানো হয় শিক্ষার্থীদের। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে শাহবাগে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটে চোখ হারিয়েছিল তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমান। সিদ্দিকের চোখের বিনিময়েও শিক্ষার্থীরা কোনো আশার আলো দেখতে পায়নি গত দু’বছরে। কিছু দিন পর পরই তাদের নামতে হচ্ছে রাস্তায়। নানা দাবিদাওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ধরনা দিচ্ছে। বারবার আশ্বাস দিয়েও শিক্ষার্থীদের আশ্বাস পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের জীবন নিয়ে যেন ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। তারা নিজে থেকে চায়নি কলেজগুলোকে ঢাবির অধিভুক্ত করা হোক। এখন অধিভুক্তির পর তাদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণের কোনো অর্থ হয় না। তাদের পাঠদান চলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে আর প্রশ্নপত্র করা হচ্ছে ঢাবির নিয়মে। একাডেমিক রুটিনে নেই কোনো সমন্বয়। ফল প্রকাশে সৃষ্টি হচ্ছে নানা জটিলতা। বাস্তবতা এমন যে, একই বর্ষের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীরা যখন মাস্টার্স শেষ করে সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করছে সেখানে অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা তখনো অনার্স ফাইনাল পরীক্ষাই দিতে পারেনি।

নাজমুল হোসেন নামের কবি নজরুল কলেজের এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, সাত কলেজে ২০১৩-১৪ সেশনে অনার্স ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা যখন পরীক্ষা দিয়ে ফলের জন্য অপেক্ষা করছেন ৫ মাস ধরে তখন একই সেশনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাস্টার্সের ফরম পূরণ করছেন এবং বিসিএস, এসআই ও শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন। একই সেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স শেষ হয়েছে অন্তত ৪ মাস আগে। তারাও বিসিএস, এসআই ও শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় সুযোগ পাচ্ছেন।

২০১৫-১৬ সেশনের সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা যখন মাস্টার্স পরীক্ষা দিচ্ছেন, তারও দুই বছর আগে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। সাত কলেজে ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থী, যাদের মাস্টার্সের ক্লাস চলমান, তখন একই সেশনের জাতীয় ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা শেষ হয়েছে অন্তত এক বছর আগে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, এসব কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বর্তমানে এক লাখ ৬৭ হাজার ২৩৬ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। এর আগে ঢাবির অধিভুক্ত কলেজ ছিল ১০৪টি। নতুন সাতটি যোগ হওয়ায় এ সংখ্যা এখন ১১১টি। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ১০৪টি কলেজ ও ইনস্টিটিউটের শিার্থী সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৬৯৮ জন, শিক্ষক সাত হাজার ৫৯১ জন। ফলে নিজস্ব ৩১ হাজার ৯৫৫ জন শিক্ষার্থীর বাইরে আরো দুই লাখ আট হাজার শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়ে হিমশিম অবস্থায় পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments