উদ্বেগ বাড়লেও তৎপরতা কম

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীতে উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে ডেঙ্গু আতঙ্ক। আগের সব রেকর্ড ভেঙে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। শুধু গত ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ৫০০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অনেক হাসপাতালে নতুন করে এসব রোগী ভর্তি করা হচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পর্যন্ত বাংলাদেশকে সহায়তার হাত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে, ডেঙ্গু নিয়ে বাংলাদেশ ‘অ্যালার্মিং’ পরিস্থিতিতে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চাই।’

ঢাকার দুই সিটির মেয়র ডেঙ্গু রোগীর বাড়ি আর হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করছেন। চারদিক থেকে সমালোচনার তীর তাদের দিকে ছুটে আসছে। কিছু মশার ওষুধ ছিটানোও হচ্ছে, হট লাইন চালু হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কমছে না ডেঙ্গুর বিস্তার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না সিটি করপোরেশনের। এখনো নানা হম্বিতম্বি করলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

এমনকি যেসব ওষুধ ছিটানো হচ্ছে তার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর, দুই মেয়র ক্রমবর্ধমান এই চাপ সামলাতে নতুন নতুন ব্যবস্থার কথা জানালেও বাস্তবে তা সামান্যই কার্যকর হচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে নগরবাসী বলছেন, মেয়ররা ছোটোছুটি করছেন কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। যা কিছু করা হচ্ছে তা পুরনো পদ্ধতি নতুন করে দেখানো হচ্ছে।
এদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, চাপ সামলাতে এখন হিমশিম খাচ্ছেন তারা। উদ্বেগের বিষয় হলো, ডেঙ্গু ক্রমশ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকজন মারাও গেছেন।

শুধু চলতি বছরের জুনে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৭৭০ জন। আর জুলাইয়ের প্রথম ১৮ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন তিন হাজার ৩০ জন। গত ১৮ জুলাই ২০১ জন ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ বছর সরকারি হিসেবে পাঁচজনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। এ ছাড়া এ সময় ঢাকার বাইরে অর্ধশতাধিক আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ খোদ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল মশার ভয়ে আগারগাঁওয়ের পরিকল্পনা কমিশনের কার্যালয়ে না গিয়ে সচিবালয়ে অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ আগারগাঁওয়ে মশার প্রকোপ বেশি।

প্রথমদিকে গা-ছাড়া ভাব থাকলেও পরিস্থিতি বোঝার পর ছোটাছুটি শুরু করেছেন ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকন। ওষুধ ছিটানোর ক্রাশ প্রোগ্রাম, ঘরে ঘরে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, হট লাইন চালু, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডেঙ্গুর লার্ভা ধ্বংসের ঘোষণা, গাপ্পি মাছ ছাড়ার উদ্যোগ নেন সাঈদ খোকন। ৬৭টি মেডিকেল টিম গঠনসহ নানা কাজের মধ্য দিয়ে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। কিন্তু দক্ষিণ সিটির বাসিন্দারা জানান, মেয়র এসব উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা সামান্যই। ঢাক ঢোল পেটানোই সার। সার্বিকভাবে এসব সুবিধা পাওয়া যায়নি।
এদিকে উত্তর সিটি করপোরেশনেরও দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। শেষদিকে মেয়র আতিকুল ইসলাম ওষুধ ছিটানো, কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল, সচেতনতা সৃষ্টিতে শোভাযাত্রা জাতীয় কিছু কর্মসূচি করছেন। কিন্তু গৃহীত সামান্য সুবিধার সবটাও নগরবাসী পাচ্ছেন না। এদিকে দুই সিটিতেই মশা নিধনের জন্য কেনা ওষুধের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ওই ওষুধ প্রয়োগের পরও মশা নিধন হচ্ছে না। এ কারণেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম এ পর্যন্ত চোখে পড়েনি। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও ডাক্তার ও নার্সকে প্রশিক্ষণ এবং হাসপাতালগুলোকে মনিটরিংয়ের আওতায় আনার কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির দায় সিটি করপোরেশন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এজন্য সমন্বয়হীনতাকেই দুষছেন তারা। সিটি করপোরেশনও দায় নিয়ে বলছে, এ জন্য যেভাবে কাজ করার দরকার, এগুলো তারা পুরোপুরি করতে পারেনি। কিন্তু তারা নতুন ওষুধ এনেছে, কিন্তু তার আগেই তো ঘটনা ঘটে গেছে।

এদিকে গতকাল শনিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিদলের প্রধান ড. এডউইন বলেন, ‘এই সমস্যা মোকাবেলায় সঠিক পরিকল্পনা দরকার। সার্বিক পরিস্থিতি বেশ জটিল। ডেঙ্গু নিয়ে বাংলাদেশ অ্যালার্মিং সিচুয়েশনে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চাই।’

এদিকে, রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলো। চাপ সামলাতে এখন অনেকটাই বেহাল দশা চিকিৎসকদের। অনেকে আবার বহিঃবিভাগ থেকেও চিকিৎসা নিয়ে ঘরে ফিরে যাচ্ছেন।

এদিকে ডেঙ্গু এবার ঢাকার বাইরেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর, নারায়ণঞ্জসহ সাভার, কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জে, খুলনা, চট্টগ্রাম, নড়াইলসহ বিভিন্ন জেলায় শতাধিক আক্রান্ত হওয়ার খবর মিলেছে। এরমধ্যে গতকাল নড়াইলে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

মফস্বল এলাকায় ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। কিন্তু ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ে কিছু প্রচারণা চোখে পড়লেও ঢাকার বাইরে বিশেষ করে মফস্বল এলাকায় এ নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে।

এ বিষয়ে আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদী সাব্রিনা জানিয়েছেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশি হচ্ছে, তবে এ নিয়ে এখনো খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ‘সচেতনতাই একমাত্র উপায়। তবে আক্রান্তদের চিকিৎসায় ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।’

উদ্বেগের বিষয় হলো ডেঙ্গু শুধু বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, নেপাল, ভুটান, ফিলিপিনস, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পূর্ব তিমুরসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে এ বছর ১৭ হাজার ১০৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ১০০ জন। শ্রীলঙ্কায় ছয় মাসেই আক্রান্ত ১২ হাজার ৩৩৬ জন, মারা গেছেন ৭৫ জনের। এভাবে হু হু করেই এশিয়ায় বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, যেভাবে বিস্তার বাড়ছে তাতে এই রোগে ভুগে বছরে ২০ হাজার লোক মারা যাবে। আর মৃতদের তালিকায় শিশুই থাকবে বেশি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments