ঈদের সড়ক মৃত্যুফাঁদ

৭১ কণ্ঠ ডেস্ক

কাছে দূরে যে যেখানেই থাকুক না কেন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে নাড়ির টানে রাজধানীবাসী ফিরে চলেন আপন ঠিকানায়, গ্রামের বাড়ি। এ জন্য বেগটাও কম পোহাতে হয় না। তবে দিন দিনই সড়কপথে এ যাত্রা ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফিরতি ঈদযাত্রা তো আরও অনিরাপদ।

ঈদ পরবর্তী প্রায় প্রতিদিনই ঝরছে তাজা প্রাণ। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদীর শিবপুরে শনিবার ভোররাতে বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন প্রাইভেটকারের চার আরোহী। তারা সিলেটে পিকনিক শেষে ঢাকায় ফিরছিলেন। আগের দিন শুক্রবার ঝরে আরও ১৫ প্রাণ। আর গত বৃহস্পতিবার একদিনেই সড়কে প্রাণ যায় ২৫ জনের। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, প্রতি ঈদেরই আগে পরের ১৩ দিনে গড়ে ৩০০ মানুষ নিহত হয়।

বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, ঈদের দিন থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি দুটিই বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। রাস্তা ফাঁকা পেয়ে গাড়ির গতি বাড়ান চালকরা। তাদের মধ্যে রয়েছে ওভারটেক করারও মনোভাব। বেপরোয়া গতিই বেশি প্রাণহানির জন্য দায়ী। এ ছাড়া দেখা গেছে, ঈদের আগে থেকে একটানা গাড়ি চালান চালকেরা। বিশ্রামের সুযোগ পান না বললেই চলে। আবার বাড়তি আয়ের আশায় নগর পরিবহনের অনেক ফিটনেসবিহীন বাসও এ সময় দূরপাল্লায় চলাচল করে। এসব যান কারিগরিভাবে ত্রুটিযুক্ত এবং চালকও থাকে অদক্ষ। এ জন্যই ঈদের সময় প্রাণহানির সংখ্যা বেশি।

এ বিষয়ে বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মিজানুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ‘ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় দুর্ঘটনা কম হয়, কারণ তখন সব এজেন্সির নজরদারি থাকে। আর ফেরার সময় বিভিন্ন জেলা থেকে গাড়ি ছাড়ে, সেখানে কিংবা মহাসড়কে অতটা নজরদারি থাকে না। বেশ কয়েক বছর ধরে দেখছি ঈদে দুর্ঘটনা বাড়ে, ফেরার সময় এ সংখ্যা আরও বেশি। ওভার স্পিড, ওভারটেক এ জন্য দায়ী। আমার মতে, মহাসড়কে নজরদারি বাড়াতে হবে। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।’ একই কথা জানিয়েছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, ‘ঈদযাত্রা কখনই নির্বিঘ্ন হচ্ছে না। এ জন্য কর্তৃপক্ষের তদারকির ঘাটতিই দায়ী। ঈদ মৌসুমে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বরং বাড়ছে। একই মহাসড়কে বিভিন্ন গতির গাড়ি চলাচল, চালকের টানা ডিউটি, অতিরিক্ত গতি, ওভারটেক এবং পৃথক লেন না থাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষসহ নানা কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। সব সংস্থা ও বিভাগের প্রস্তুতি থাকে ঈদের আগে। ঈদের পরে তৎপরতা চোখে পড়ে না। এ কারণেই তখন দুর্ঘটনা বাড়ে।’

যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, গত ঈদুল ফিতরে যাতায়াতে দেশের সড়ক-মহাসড়কে ২৩২টি দুর্ঘটনায় ২৭৩ জন নিহত ও ৮৪৯ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়Ñ ২৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ বাস; ২৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ মোটরসাইকেল; ২৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান, লরি; ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ কার-মাইক্রোবাস; ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ অটোরিকশা; ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ নছিমন-করিমন এবং ৪ দশমিক ৭১ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক দায়ী। সংগঠিত দুর্ঘটনার ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৪৪ দশমিক ৮২ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা, ১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ায় এবং ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

আগের বছর ঈদুল আজহায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত হয়েছেন বলে তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। ওই ঈদ মৌসুমে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোয় ২৩৭টি দুর্ঘটনায় কমপক্ষে আরও ৯৬০ জন আহত হয়েছেন। সংগঠনটির মতে, নিহতের সংখ্যার হার কমলেও আগের ঈদুল ফিতরের তুলনায় দুর্ঘটনা ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ ও আহত ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। এ বছর ঈদুল আজহায় কী পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটেছে তার প্রতিবেদন যাত্রী কল্যাণ সমিতির আজ প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছে।

এদিকে বুয়েটের জরিপ মতে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ১০ শতাংশ। অর্থাৎ চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতির কারণে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। দেখা গেছে, ঈদের আগে যানজটের কারণে সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের গতি কম থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও বেশি থাকে। এ জন্য যাত্রী পরিবহন বেশি হলেও দুর্ঘটনার হার কম। কিন্তু ফিরতি যাত্রায় সড়ক অনেকটাই ফাঁকা থাকার কারণে চালকেরা ইচ্ছামতো গাড়ির গতি বাড়ান। দ্রুত যাত্রী নামিয়ে পুনরায় ধরার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন তারা।

সংশ্লিষ্টরা জনান, ফাঁকা সড়কে বেশি গতির যানবাহনগুলো কম গতির যানবাহনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় প্রায়ই দুর্ঘটনার জন্ম দেয়। মহাসড়কে দূরপাল্লার পথের বাস ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিতে চলে। গড়ে প্রতি এক মিনিট পরপর এসব বাস অন্য যানকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পেরিয়ে যাওয়ার (ওভারটেক) চেষ্টা করে। তাই গতি ও চালকের বেপরোয়া মনোভাব বন্ধ না হলে দুর্ঘটনা কমানো যাবে না। ঈদের সময় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হন পথচারীরা। আবার বাস ও মোটরসাইকেলেও প্রচুর দুর্ঘটনা ঘটে। একই সড়কে ছোট, বড়, কম ও বেশি গতির যানবাহন চলাও এর জন্য দায়ী।

বুয়েটের এআরআইয়ের গবেষণার তথ্যানুসারে, ২০১৬ থেকে গত ঈদুল ফিতর পর্যন্ত সাতটি ঈদ উদযাপিত হয়েছে। এসব ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৬১৩ জন। প্রতি ঈদের আগে-পরের সময়টাতে গড়ে প্রাণ হারান ২৩০ জন। গত ঈদুল ফিতরে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে ১৭২টি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৫৪ জনের। এর মধ্যে ঈদের আগের সাত দিনে ৫০টি দুর্ঘটনা ঘটে। আর ঈদের দিন থেকে পরের আট দিনে দুর্ঘটনার সংখ্যা ১২২টি। ঈদের আগে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ৭২ জনের। পরের আট দিনে প্রাণ হারান দ্বিগুণ, ১৪৪ জন। এবারের ঈদুল আজহার চিত্রও এমনই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ‘ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ঈদের আগে-পরের দিনগুলোয় যেন সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালানো হয়, এ জন্য চালক-মালিককে বলাও হয়। রাস্তার কারণে যেন দুর্ঘটনা না ঘটে সে ব্যাপারেও সতর্ক সবাই।’

Facebook Comments