ঈদের পর তৃণমূল সম্মেলন

আলোকিত সকাল ডেস্ক

দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলন ও বিরোধী শক্তির দূরদর্শিতা মাথায় রেখে তৃণমূলে দল গোছাতে মাঠে নামছে আ.লীগ। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সহযোগী সংগঠনগুলোর জাতীয় সম্মেলনেরও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে দলের সিনিয়র নেতাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন আ.লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ঈদের পর তৃণমূল সম্মেলন শুরু হবে।

তথ্য মতে, আ.লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল আগামী অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে আ.লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনের করার ইচ্ছাপোষন করে প্রস্তুতি নিতে সিনিয়র নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

দলীয় প্রধানের নির্দেশনার পর কাউন্সিল নিয়ে তৎপরতা শুরু করেছেন নেতারা। যার আমেজ তৃণমূল পর্যায়েও পড়েছে। সম্প্রতি দলের প্রেসিডিয়াম সভায় জাতীয় কাউন্সিল সফল করতে ৮ বিভাগে ৮টি টিম গঠন করা হয়েছে।

আ.লীগ সূত্র মতে, জাতীয় সম্মেলনের আগেই দলের তৃণমূল সম্মেলন করার জন্য নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্যোগ নেওয়া হবে মেয়াদ উত্তীর্ণ জেলা ও উপজেলা কমিটির সম্মেলনের।

বিশেষ করে যেসব জেলার কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ আছে, সেসব জেলার সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে জাতীয় সম্মেলনের মূল কাজ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো নিশ্চুপ থাকলেও ক্ষমতাসীন আ.লীগ রাজনীতির মাঠ চাঙ্গা করে রাখছেন। একের পর এক ইস্যু কারণে গোটা দেশ ক্ষমতাসীনদের দিকে।

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আ.লীগের তৃণমূল রাজনীতি এখন তুঙ্গে। প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপি নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্তে নিজ দলের মধ্যে অনেকটা উন্মুক্ত নির্বাচনি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এমন সময় জাতীয় কাউন্সিলের ঘোষণা দলটির রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ এনেছে।

সূত্র মতে, সারা দেশে আ.লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক কমিটি রয়েছে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের মধ্যেই বেশিরভাগ জেলার ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়।

এরপর ঐ দুই জনের নেতৃত্বে কেটে গেছে অন্তত দেড় বছর। এরপর দেওয়া হয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি। আর এরই মধ্যে প্রতিটি কমিটি অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধশত কমিটিতে রয়েছে অন্তর্কোন্দল।

তারা যার যার মতো কাজ করছে। এতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। যার ক্ষমতা বেশি সে টেন্ডার ছিনিয়ে নিচ্ছে।

ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলা আ.লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয় ২০০২ সালের ২৭ মার্চ। ওই আহ্বায়ক কমিটির ৩ মাসের মধ্যে সম্মেলন করে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও সাড়ে ১৪ বছর পর ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়।

টাঙ্গাঈল জেলা সম্মেলন ২০১৫ সালের ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হলেও ২০১৬ সালের ২০ মার্চ টাঙ্গাইল জেলা আ.লীগের ৭১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। মাদারীপুর জেলা কমিটি ২০১৩ সালে করা হলে তার সম্মেলন কয়েক বছর আগে হয়েছিল। শরীয়তপুর জেলা আ.লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি।

ঐ সম্মেলনে ঘোষিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে ঢিলেঢালা কার্যক্রম চলে প্রায় দুবছর। ঐ দুই নেতার একপেশি সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয় তৃণমূল নেতারা। ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ পূর্ণাঙ্গ কমিটি পায় জেলাটি। গঠিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি বিতর্কের বাইরে রাখা যায়নি। বিশেষ ব্যক্তির পছন্দের কারণে কমিটিতে জামায়াতপন্থিদের স্থান দেওয়া হয়।

এছাড়া ছাত্রলীগ থেকে সরাসরি মূল দলে এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের জেলার গুরুত্বপূর্ণ পদে আনার অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে জেলা কমিটি শক্ত অবস্থান গড়তে পারেনি। সম্মেলন ছাড়াই ২০১৭ সালের ২৩ জুলাই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হয় গাজীপুর জেলার। একই অবস্থা গাজীপুর মহানগর কমিটির।

কিশোরগঞ্জ জেলা সম্মেলন ২০১৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। মানিকগঞ্জ ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি, মুন্সিগঞ্জ ২১ জুন ২০১৪ সাল, নরসিংদী ১৪ জানুয়ারি ২০১৫, রাজবাড়ী ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর, ফরিদপুর ২০১৬ সালের ২২ মার্চ সম্মেলন হলেও প্রায় দুবছরের মাথাথ পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়া হয়।

চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর আ.লীগের তিন কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। এর মধ্যে উত্তর জেলা ও মহানগর আ.লীগের দুই সভাপতির মৃত্যুতে ভারপ্রাপ্ত দিয়েই চলছে সাংগঠনিক কার্যক্রম।

২০০৬ সালের ২৭ জুন চট্টগ্রাম মহানগর আ.লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে দলটির চট্টগ্রামের প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সভাপতি এবং কাজী ইনামুল হক দানু হন সাধারণ সম্পাদক।

ইনামুল হক দানু মারা যাওয়ার পর ২০১৩ সালের জুনে সম্মেলন ছাড়াই এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সভাপতি ও বর্তমান মেয়র আজম নাছির উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর কমিটি করা হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে মারা যান মহিউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। তার মৃত্যুর পর মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়।

চট্টগ্রাম নগর আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আজম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘নেত্রীই কমিটি করবেন। কেন্দ্র যখনই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেবে, তখনই আমরা সিদ্ধান্ত মেনে নেব। থানা কমিটি গঠন কাজ চলমান আছে।’

২০১২ সালের ২৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আ.লীগের কমিটি ও ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল দক্ষিণ জেলা কমিটি গঠিত হয়। ২০১১ সালে সিটি কর্পোরেশন গঠনের পর ২০১৭ সালের জুলাই মাসে সম্মেলন ছাড়াই কুমিল্লা মহানগর আ.লীগের কমিটি দেয়া হয়।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা সম্মেলন ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ও কুমিল্লা উত্তর জেলা সম্মেলন ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ অনুষ্ঠিত হয়।
চাঁদপুরে ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি সম্মেলন হয়। সম্মেলনের প্রায় ২২ মাস পর ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর চাঁদপুর জেলা আ.লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

ফেনী জেলা সম্মেলন ২৫ ডিসেম্বর ২০১২ সালে, লক্ষীপুর জেলা সম্মেলন ৩ মার্চ ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়। নোয়াখালী জেলা সম্মেলন ২০১৪ সালে ১৫ সেপ্টেম্বর, কক্সবাজার জেলা সম্মেলন ২৮ জানুয়ারি ২০১৬ অনুষ্ঠিত হয়। রাঙ্গামাটি জেলা সম্মেলন ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত হলেও ২০১২ সালের ৮ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হয়।

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি খুলনা জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন মাঠে জেলা আ.লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে শেখ হারুনুর রশীদ সভাপতি ও এসএম মোস্তফা রশিদী সুজা এমপি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এরপর প্রায় ১০ মাস পর কেন্দ্র থেকে জেলা আ.লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেয়া হয়। নব-নির্বাচিত ওই কমিটি এক মাসের মধ্যে প্রত্যেকটি উপজেলা আ.লীগের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু গত সাড়ে তিন বছরেও অনেক উপজেলায় কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। ২০১৫ সালের ২ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গা জেলা সম্মেলন করা হয়।

বরিশাল বিভাগের বরগুনা জেলা আ.লীগের সম্মেলন ২০১৪ সালের ১৬ নভেম্বর বরগুনা স্মৃতি কমপ্লেক্স চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ভোলা জেলা সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি ঘোষণা করা হয়। পটুয়াখালীর জেলা পূর্ণাঙ্গ কমিটি ২০১৬ সালের ১৫ জুন অনুমোদন করা হয়। এর আগে ২০১৪ সালের ১৪ নভেম্বর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

বরিশাল জেলা সম্মেলন ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর হলেও ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়। ঝালকাঠি জেলা আ.লীগের সম্মেলন ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। পিরোজপুর জেলা সম্মেলন হয় ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর।
সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলা সম্মেলন ২০১৩ সালে ২৫ জুন। ২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলা আ.লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের ১৫ মার্চ পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়া হয়।

ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলা কাউন্সিল ২০১৫ সালের ২০ মে অনুষ্ঠিত হয়। নেত্রকেনায় ২০১৪ সালের সম্মেলন হলেও ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। শেরপুর জেলা সম্মেলন ২০১৫ সালের ১৫ মে, ময়মনসিংহ জেলা আ.লীগের সম্মেলন ২০১৬ সালে ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় দুবছর পর ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ জেলা আ.লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

রংপুর বিভাগের পঞ্চগড় জেলা সম্মেলন ২০১২ সালের ২৪ ডিসেম্বর হলেও ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

ঠাকুরগাঁও জেলা সম্মেলন ২০১৪ সালের ১৬ অক্টোবর, দিনাজপুর জেলা সম্মেলন ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে হলেও ২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর কমিটি। রংপুর ২০০৮ সালে সম্মেলন, কুড়িগ্রাম ২০১৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সম্মেলন হয়েছে। গাইবান্ধা জেলা ২০১৬ সালের ১২ মার্চ সম্মেলন হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগের সিরাজগঞ্জ জেলা সম্মেলন ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি, নওগাঁ ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর সম্মেলন, নাটোর ২০১৪ সালের ২ ডিসেম্বর, জয়পুরহাট জেলা সম্মেলন ২০১৪ সালের ০৯ নভেম্বর, বগুড়া ২০১৪ সালের ১০ডিসেম্বর সম্মেলন ও ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর কমিটি দেয়া হয়েছে।

আ.লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, আমাদের প্রত্যকটি জেলায়-উপজেলায় কমিটি আছে। যেস কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে, সেই জায়গাটি চিহূিত করে আমরা সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আ.লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, জাতীয় কাউন্সিল অক্টোবরে হবে। আমাদের সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী সম্মেলনের আগে বিভিন্ন ইউনিটে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন করেই জাতীয় কাউন্সিল করা হয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments