ঈদের আনন্দ নেই বিএনপিতে

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীর অলিগলিতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঈদ শুভেচ্ছা ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন দেখা গেলেও ব্যতিক্রম বিএনপি। রাজধানীর কোথাও চোখে পড়ছে না দলটির নেতাকর্মীদের এমন আয়োজন, যা বিগত বছরগুলোতে ছিল ঈদ আয়োজনের অংশ বিশেষ। শুধু বাইরের আয়োজনই নয়, ঈদ উদযাপনে নেই কোন অভ্যন্তরীণ আয়োজনও। উৎসবটি উৎযাপনে মানুষ যখন রাজধানী ছেড়ে ছুটে গেছেন নিজ নিজ গ্রাম-শহরে প্রিয়জনদের কাছে। পরিকল্পনা করেছেন কিভাবে পালন করবেন এই উৎসব। ঠিক তখনই এর ভিন্ন চিত্র বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া টানা তৃতীয় ঈদ পার করছেন কারাবন্দি অবস্থায়। যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই অবস্থায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ঈদের খুশীতে কিছুটা ভাটা পড়েছে।

ঈদের দিনে বিএনরি পক্ষ থেকে তেমন কোন আয়োজন না থাকলেও নেতাকর্মীদের নিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর তিনি সিনিয়র নেতাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাতের চেষ্টা করবেন।বেগম জিয়া কারাবন্দি হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি ঈদেই নেতাকর্মীসহ কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ, সুধীজনদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। এটি ছিল নেতাকর্মীদের কাছে ঈদের অন্যতম আনন্দঘন মূহুর্ত। বেগম জিয়া ১৬ মাস ধরে কারাবন্দি থাকায় সোমবার পর্যন্ত এমন আয়োজনের বিষয়ে নিশ্চিত করেনি বিএনপি।

দলের সিনিয়র নেতাদের অধিকাংশই এবারের ঈদে ঢাকায় থাকছেন। দলীয় প্রধানকে কারাবন্দি রেখে ঈদ উৎসবে আগ্রহ নেই তাদের। প্রতিবছরই ঈদ করতে গ্রামে যান জাতীয়তাবাদী মৎসজীবী দলের কেন্দ্রীয় নেতা আরিফুর রহমান তুষার। কিন্তু এবারের ঈদ নিয়ে তার যেন কোন আগ্রহই নেই। ঈদ করতে বাড়ি যাবেন না? জিজ্ঞেস করতেই উত্তর- আমাদের কিসের ঈদ? আমার মা (খালেদা জিয়া) কারাগারে আর আমরা ঈদের আনন্দ করবো! কারো মা কারাবন্দি থাকলে সন্তানরা কি ঈদ উদযাপন করতে পারে? গত ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর থেকেই তুষার অবস্থান করছেন নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার বলেন, ঈদে আমাদের কোন আনন্দ নেই। আমাদের নেত্রী, আমাদের মা বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করার পর থেকেই সব আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। সকলে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঈদ উৎসব পালন করছে। তুষার ও বাশারের মতো অধিকাংশ বিএনপি নেতাকর্মীই দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দী থাকায় ঈদ উৎসবে আগ্রহ হারিয়েছে। এদিকে কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই যাচ্ছেন না গ্রামের বাড়িতে। নিজ নিজ এলাকায় নির্যাতিত, জেল-জুলুম, গুম-খুনের শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় ঈদ উপহার পাঠিয়ে এবং নেতাকর্মীদের খোঁজ-খবরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছেন ঈদের আনন্দ।

সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মী এখনো কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাদের পরিবারে তো আমরা ঈদের আনন্দ দেখি না। তাহলে আমরা কিভাবে ঈদের উৎসব করবো। তিনি বলেন, যেদিন আমাদের প্রাণের নেত্রী বেগম জিয়া স্বৈরাচারী সরকারের কারাগার থেকে মুক্ত হবেন সেদিনই হবে আমাদের প্রকৃত ঈদ উৎসব, ঈদের আনন্দ।

ঈদের দিনও নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়েই থাকবেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে তিনি দলীয় কার্যালয়েই এক প্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় অবস্থান করছেন। খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর বিএনপি কার্যালয়ে এটি রিজভীর টানা তৃতীয় ঈদ। ঈদের দিনে কি করবেন জানতে চাইলে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ঈদের যে আনন্দ সেটি তো আমাদের নেই। কারণ আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি। এ অবস্থায় আমাদের উৎসব বা আনন্দ করার কোন আগ্রহ জাগে না। শুধু বিএনপিই নয়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়া এবার কারো ঈদের উৎসব নেই মন্তব্য করেছেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, হাজার হাজার মানুষ হত্যা,গুম, খুন, ধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের পরিবারের কি ঈদ আছে? কৃষকরা ধানের দাম পাচ্ছে না, শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছে না, প্রবাসীরা চাকরি হারাচ্ছেন, দেশে বেকারত্বের গ্লানিতে জর্জরিত লাখ লাখ যুবক তাদেরও কি ঈদ আনন্দ আছে?

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, এবার ঈদ আমাদের জন্য কোন উৎসবের নয়। আমাদের নেত্রী জেলখানায় বন্দি। এই অবস্থায় আমরা কিভাবে আনন্দ করবো, কিভাবে উৎসব পালন করবো। তিনি বলেন, ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের মধ্যে যেটুকু প্রয়োজন সেটি ছাড়া বাড়তি কোন আয়োজন নেই।

ঈদে কে কোথায়? এবারের ঈদে বিএনপির বেশিরভাগ নেতা ঢাকায় থাকবেন। এদের মধ্যে- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, বেগম সেলিমা রহমান, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, শওকত মাহমুদ ও অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাবিহ উদ্দিন আমেদ, রিয়াজ রহমান, সুকোমল বড়ুয়া, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ঢাকায় থাকছেন।

অন্যদিকে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ নোয়াখালী, ড. আব্দুল মঈন খান নরসিংদীতে, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামে ঈদ করবেন। মির্জা আব্বাস এবং নজরুল ইসলাম খান ওমরা হজ্ব পালনের জন্য সৌদিতে অবস্থান করছেন। স্থায়ী কমিটির এই দুই সদস্য সেখানেই ঈদ করবেন। ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে আলতাফ হোসেন চৌধুরী পটুয়াখালী, এম মোর্শেদ খান, আবদুল্লাহ আল নোমান, মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চট্টগ্রামে, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বরিশালে এবং শামসুজ্জামান দুদু চুয়াডাঙ্গায় ঈদ করবেন। যুগ্ম মহাসচিব মজিবুর রহমান সরোয়ার বরিশালে, খায়রুল কবির খোকন নরসিংদীতে ঈদ করবেন। আর আসলাম চৌধুরী ও হাবিব উন নবী খান সোহেলকে কারাগারে ঈদ করতে হচ্ছে। সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন গাজীপুরে, এমরান সালেহ প্রিন্স ময়মনসিংহে, শামা ওবায়েদ ফরিদপুরে, স্বেচ্ছাসেক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ মুন্সিগঞ্জে ঈদ করবেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box