ইজারা দিয়ে দীঘি ‘হারিয়েছে’ রেল

আলোকিত সকাল ডেস্ক

হাজার কোটি টাকার প্রায় ৫৫ একরের তিনটি জলাশয় ইজারা দিয়ে ‘হারিয়েছে’ চট্টগ্রাম রেল। আইনি মারপ্যাঁচে ইজারাদাররা ‘দখল’ করে রেখেছে সেগুলো। মাছ চাষের জন্য ইজারা নিয়ে পুকুরগুলোর বড় অংশ ভরাট করে ঘরবাড়ি, বাণিজ্যিক স্থাপনা তুলেছে তারা। বিক্রি করে দিয়েছে পুকুরের পাড়। সেখানে এর মধ্যেই গড়ে উঠেছে বস্তিঘর ও দোকানপাট। ইজারার টাকাও পাচ্ছে না রেল।

চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্রের এই তিন দীঘি হলো- আগ্রাবাদ ডেবা, পাহাড়তলী জোড় ডেবা ও ভেলয়ার দীঘি। রেলের পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে বেদখল হয়েছে এসব দীঘি।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ ফারুক আহমদ সমকালকে বলেন, সীমিত জনবলের কারণে ভূসম্পত্তি রক্ষা করা রেলের জন্য কঠিন। সরকারি সম্পদ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। সরকারি জায়গা সাময়িকভাবে বেদখল হলেও শেষ পর্যন্ত তা দখলমুক্ত হবেই। পর্যায়ক্রমে রেলের জায়গা-জমি অবৈধ দখলমুক্ত করতে শিগগিরই সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে।

জোড় ডেবায় শতাধিক বসতঘর :রেলের নথি থেকে জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে নগরীর পাহাড়তলী জলাধার তৈরি করে রেলওয়ে। যা পরিচিত ‘জোড় ডেবা’ নামে। ২১ একরের এ জলাধারটি মাছ চাষের জন্য ১৯৯৬ সালে ইজারা নেন স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল হাই। দীঘির পাড় তখন বেদখল হতে শুরু করে। এর পরও ২০০২ সালে আবদুল হাই আরও পাঁচ বছরের জন্য দীঘিটি ইজারা পান। অবৈধ বস্তিঘর তখন আবারও বাড়ে।

২০০৩ সালে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে অবৈধ দখলের সত্যতা পেয়ে ইজারা চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে আবদুল হাই উচ্চ আদালতে যান। তার মৃত্যুর পর উচ্চ আদালত তার স্ত্রী হাসনা হেনাকে দীঘি ইজারার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেন। একপর্যায়ে তিনিও মারা যান। এরপর দীঘির ইজারা পান আবদুল হাইয়ের ভাতিজা আবদুল লতিফ। অভিযোগ, তাকে ইজারা পাইয়ে দিতে রেলের একটি ‘সিন্ডিকেট’ ভূমিকা রাখে। মাছ চাষের জন্য ইজারা নিয়ে জলাধারটিকে বস্তিতে পরিণত করেন ইজারাদার আবদুল লতিফ।

সরেজমিন দেখা গেছে, দীঘির পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে কাঁচা ও আধাপাকা শতাধিক বসতঘর ও দোকানপাট। আকার ভেদে এসব ঘর থেকে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হয়। দোকানিরা জানান, তারা আবদুল লতিফের কাছ থেকে দোকান ‘কিনে’ নিয়েছেন।

ইজারাদারের পরিবারের সদস্য এবং আবদুল মান্নান, মাবুদ, মো. আসিফ, মো. সেকান্দার হোসাইন, মো. শাহজাহান, রহিমা আকতার, শাহীনা আকতার ও নিরুসহ কয়েকজন ব্যক্তি এখানে ‘স্থায়ীভাবে জমি কিনে’ ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন। প্রতি মাসে তারা ভাড়া আদায় করেন।

জোড় ডেবা দীঘির পাড়কে বস্তিতে পরিণত করায় এবং অবৈধভাবে দোকানপাট নির্মাণ করায় ২০১৭ সালের ৭ মার্চ অবৈধ দখলদারদের নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর দুই বছর পেরোলেও দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উচ্ছেদের পথে পা বাড়ায়নি রেল। অভিযোগ, দীঘির পাড়ের বস্তি মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।

রেলের দীঘির পাড় দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে আবদুল লতিফ বলেন, তিনি অবৈধ কোনো কাজে যুক্ত হননি বা রেলের জমিও কারও কাছে বিক্রি করেননি।

রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা কিসিঞ্জার চাকমা জানিয়েছেন, পাহাড়তলীর জোড় ডেবা ইজারা নিয়ে এর পাড় দখল করে বস্তিঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এটি দ্রুত উচ্ছেদ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে রেলের সব জলাধারেই এমন অভিযান চালিয়ে অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে।

বর্জ্য ফেলে ভরাট করা হচ্ছে ভেলুয়ার দীঘি :পাহাড়তলী স্টেশনের পশ্চিমে ১৩ দশমিক ৭৪ একর আয়তনের ভেলুয়ার দীঘিটি রেলওয়ে স্কাউটসের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছিল। সংগঠনকে ইজারা দেওয়ার আগে রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ইজারা নবায়ন হবে না। ৩০০ টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে দু’পক্ষের মধ্যে এ সংক্রান্ত চুক্তিও হয়। এ চুক্তির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেছে রেলওয়ে স্কাউটস। এরপর থেকে দীঘিটির ইজারার টাকাও পাচ্ছে না রেলওয়ে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভেলুয়া সুন্দরীর নামে রাখা এ দীঘি চারপাশ থেকে দেখা যায় না। দীঘির পূর্বদিকে রেলওয়ের কিছু কোয়ার্টার রয়েছে। পাহাড়তলী বাজারের অংশে কিছু দোকান ও অবৈধ বস্তি গড়ে উঠেছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব বস্তিঘর ও দোকান থেকে ভাড়া আদায় করেন।

দীঘির পশ্চিমপাড়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি। এ ছাড়া পাহাড়তলী বাজারের একাংশও বিস্তৃত হয়েছে দীঘির পশ্চিম পাড়ে। ঢাকা ট্রাঙ্ক (ডিটি) রোডের প্রান্ত থেকে দীঘিটি এখন আর দেখাই যায় না। দীঘির উত্তর পাড়জুড়েও রয়েছে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বসতঘর। আর দীঘির দক্ষিণ পাড়ে পাহাড়তলী বাজার। বাজারের দোকানগুলো পাড় থেকে দীঘির অনেকখানি জায়গা দখল করে রেখেছে। এ অংশ ভরাট করা হচ্ছে বর্জ্য ফেলে।

ইজারা দেওয়া যাচ্ছে না আগ্রাবাদ ডেবা :চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র আগ্রাবাদে রয়েছে রেলের ‘আগ্রাবাদ ডেবা’। ২০ একর আয়তনের এ দীঘিরও একটি বড় অংশ দখল হয়ে গেছে। জলাধার ইজারা নিয়েছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রহমত আলী। তিনি মারা গেলে তার স্ত্রী-সন্তানরা দীঘিটি ভরাট করছে। রেলের সঙ্গে ইজারাদারের মামলা থাকায় এ দীঘি থেকেও রাজস্ব পাচ্ছে না রেলওয়ে। কয়েক যুগ ধরে চলছে এ মামলা। একাধিকবার দরপত্র ডেকেও এটি ইজারা দিতে পারেনি রেলওয়ে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments