আমে চাঙ্গা রাজশাহীর অর্থনীতি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজশাহীর আমে নির্ভর করে এখানকার অর্থনীতির একটি বড় অংশ। পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজারেই কেবল বছরে এই আমের বেচাকেনা হয় অন্তত দেড়-দুই হাজার কোটি টাকার। ফলে বছরের এই সময়টাই আমময় হয়ে ওঠে গোটা রাজশাহী। আমকেন্দ্রিক রাজশাহীতে গড়ে ওঠে পরিবহন ব্যবসা থেকে শুরু করে, আমের ঝুড়ি, ধানের খড়, পুরনো পত্রিকা, প্লাস্টিকের ক্যারেট, চিকন দড়ি এবং কুরিয়ার ব্যবসা। এসব ব্যবসাও হিসেবে কয়েক কোটি ছাড়িয়ে যায়। একমাত্র কুরিয়ার ব্যবসায় গড়ে দুই কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। কুরিয়ারগুলোয় এ সময় যেন পোয়াবারো অবস্থা বিরাজ করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী জেলার বাঘা, চারঘাট, পুঠিয়া, দুর্গাপুর ও পবা এলাকায় সবচেয়ে বেশি আমের উৎপাদন হয়। এ ছাড়া বাকি চারটি উপজেলার মধ্যে হালে গোদাগাড়ীতে বেশ কিছু নতুন নতুন আমের বাগান গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিকভাবে। এর বাইরেও জেলার মোহনপুর, তানোর ও বাগমারাতেও আম চাষ হয়। ফলে বছরের এই সময়টার দিকে তাকিয়ে থাকে গোটা জেলার মানুষ। প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়ের আগে কেউ আম পাড়তে পারেনি। ফলে সাতটি ধাপে পর্যায়ক্রমে রাজশাহীতে আম পাড়া হচ্ছে।

প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী রাজশাহীতে গত ১৫ মে থেকে গুটি আম পাড়া শুরু হয়েছে। এরপর ২০ থেকে গোপালভোগ, ২৫ মে থেকে রানীপ্রসাদ ও লক্ষ্মণভোগ আম পাড়া শুরু হয়।

আজ ২৮ মে থেকে হিমসাগর, ৬ জুন থেকে লেংড়া, ১৬ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি এবং আশ্বিনা আম পাড়া যাবে পহেলা জুলাই থেকে।

জেলার বাঘা উপজেলার আম ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা মেনে আজ থেকে আমরা আম বাজারজাত শুরু করেছি। গত বছরের চেয়ে এবার পাঁচ দিন আগে থেকেই বাজারে আম আসতে শুরু করেছে। গত বছর ২০ মে থেকে বাজারে আম কেনাবেচার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল প্রশাসন থেকে। এবার সেখানে দেওয়া হয় ১৫ মে। এবারও দেশের সবচেয়ে বড় আমের হাট বসেছে পুঠিয়ার বানেশ্বরে। আম কেনাবেচায় ভরে উঠেছে বানেশ্বরের বাজার। ফলে ব্যবসায়ী ও আম চাষিরা এখন পুরোদমে ব্যস্ত সময় পার করছে।

রাজশাহীর বাজারে এখন গুটিজাতের আম বিক্রি হচ্ছে পাঁচ থেকে আট শ টাকা মণ। আর গোপালভোগ বিক্রি হচ্ছে ১৪-১৮ শ টাকা মণ। হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাতি বিক্রি হবে আজ থেকে। এ বাজারে আম বিক্রি করতে আসা জেলার দুর্গাপুরের আম ব্যবসায়ী ওয়াজনবী বলেন, ‘এবার বাজার শুরু থেকেই ভালো। আমের দাম সামনে আরো বেশি হবে বলে আশা করি।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী অঞ্চলের দুটি বড় আমের মোকাম রাজশাহীর বানেশ্বর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট বাজার মিলে প্রতিদিন বেচাকেনা হয় অন্তত দুই কোটি টাকার আম। আমের কারবার নিয়ে রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানও হয়ে ওঠে।

বানেশ্বর বাজার ঘিরে আমের ঝুড়ি, কুরিয়ার, আমের ক্যারেট, পুরনো পত্রিকা ব্যবসাও এখন জমজমাট আকার ধারণ করেছে। এক কেজি আম কুরিয়ার করতে কুরিয়ার সার্ভিসগুলো অন্তত ১৫ টাকা করে আদায় করছে। ঢাকার বাইরে সেটি গিয়ে ঠেকছে ২৫ টাকা পর্যন্ত। এভাবে গড়ে বছরে দুই কোটি টাকার ওপরে শুধু কুরিয়ার ব্যবসা করে থাকে কম্পানিগুলো। সবচেয়ে বেশি ব্যবসা হয়ে থাকে এসএ পরিবহনের এই প্রতিষ্ঠানটিতে। গলাকাটা টাকাও আদায় করে গ্রাহকদের কাছ থেকে এমনটিই অভিযোগ করেছেন আম কুরিয়ার করতে আসা আমির উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, রাজশাহী থেকে ঢাকায় আম পাঠাতে এসএ পরিবহনকে দিতে হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৫ টাকা করে। ঢাকার বাইরে নিচ্ছে তারা ২৫ টাকা হারে। গলাকাটা টাকা আদায় করছে তারা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এন কে নোমান বলেন, ‘অর্থনীতিতে আমের যেই ভূমিকা রাজশাহীতে এখনো বড় হয়ে আছে। আমের সময় এখানকার অর্থনীতি চাঙ্গা হয়।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক এস এম আব্দুল কাদের বলেন, ‘আম সুষ্ঠুভাবে বাজারজাত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। এবারও শতভাগ ফরমালিনমুক্ত রাজশাহীর আম যেন মানুষ খেতে পারে তার জন্য সব চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

চলতি বছর রাজশাহীতে আমের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে। এখান থেকে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ ১৩ হাজার ৪২৬ মেট্রিক টন। গত বছর রাজশাহীতে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৭ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box