আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় দেড়বছর

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বহুল আলোচিত পুরান ঢাকার দর্জি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলার রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ৮ আসামির মধ্যে দুই জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছিল হাইকোর্ট। আর ৪ জনের সাজা পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন ও দুইজনকে খালাস দেয়া হয়। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদনও করা হয়েছে। এরপর প্রায় দেড় বছর সময় পেরিয়ে গেছে মামলাটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট আলোচিত এ মামলায় রায় ঘোষণা করে।

প্রায় তিন মাস পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় মামলাটির। হাইকোর্টে এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নজিবুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষের আরেক আইনজীবী ছিলেন বর্তমান ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মনিরুজ্জামান রুবেল। জানতে চাইলে তিনি দৈনিক জাগরণকে বলেন, এই মামলার শেষ দিকে আমি ওই বেঞ্চে রাষ্টপক্ষের আইনজীবী হিসেবে যুক্ত হয়েছিলাম। তবে পুরো মামলাটি রাষ্ট্রপক্ষে লড়েছিলেন প্রয়াত নজিবুর রহমান। তিনি হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করার জন্য নোট পাঠিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় একই বছরের ৫ ডিসেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয় বলে অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড সুফিয়া খাতুনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

মামলাটি বর্তমানে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।

এই মামলায় হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া আপিলকারী দুইজনকে খালাস দেয়া হয়েছে। হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতের সাজা কেন, কী কারণে পুরোপুরি বহাল রাখা যায়নি, তার পূর্ণব্যাখ্যা ও পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে ৮০ পৃষ্ঠার রায়ে।

তাছাড়া বিশ্বজিতকে হত্যার পর থানায় অপমৃত্যুর মামলা, বিশ্বজিতের লাশ তাড়াহুড়ো করে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে তা দাহ করা, ঘটনার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেফতার না করা, সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে অস্বচ্ছতার বিষয়ে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।

হাইকোর্টের দেয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, “ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় অস্বচ্ছ তদন্তকাজ প্রতিরোধ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে বিত্তশালী ও ক্ষমতাধররা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দায়মুক্তি পেয়ে যায়।”

“অপরাধ করার পরও প্রভাব খাটিয়ে তারা খুব সহজেই তদন্ত প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে যায়। এ রকম অনেক মামলা আছে যেখানে পুলিশ, অপরাপর তদন্ত সংস্থা, চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদন দিয়ে অপরাধীকে সাহায্য করেছে।”

“অনেক সময় রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য তারা বেআইনিভাবে এমনটা করে থাকে। এভাবে অসৎ ও উদ্দেশ্যমূলক তদন্ত কার্যক্রম চলতে পারে না প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে এবং তার জবাবদিহি থাকতে হবে।”

বিচার বিভাগ অপরাধীকে সাজা দেয়ার মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যদি ভূমিকা না রাখে, নিরাপরাধ জনগণকে যদি নিরাপত্তা না দেয়া হয় তবে আইনের শাসন মুখ থুবড়ে পড়বে বলে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।

রায়ে বলা হয়, “এই ভূখণ্ডে গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র রাজনীতির বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু ছাত্র রাজনীতির নামে কিছু যুবক আজ অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তাদের কারণে ছাত্র রাজনীতি মারাত্মকভাবে কলঙ্কিত হচ্ছে। কোনো কোনো সময় তারা নিজ নিজ এলাকায় নিরঙ্কুশ প্রভাব বিস্তারের জন্য ন্যক্কারজনকভাবে ক্ষমতা ও পেশিশক্তি প্রদর্শন করছে। তথাকথিত কিছু রাজনৈতিক নেতা তাদের নিজেদের স্বার্থে এদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে।”

সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে হাইকোর্টের রায়ে আরও বলা হয়, “আমরা সংবাদমাধ্যমে আরও দেখেছি যে, পরীক্ষায় নকল করতে না দেয়ায় শিক্ষককে পেটানো হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনের আবাসিক ভবনে প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে এমনকি সাধারণ ছাত্রদের জিম্মি করে ইচ্ছার বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিংয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির নামে এই পরিস্থিতি উদ্বেগ ও হতাশাজনক উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, ‘বিষয়গুলো খুবই উদ্বেগজনক এবং হতাশাজনক। জাতি এর থেকে মুক্তি চায়।”

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলীয় জাতীয় নেতাদের কাছে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে রায়ে।

তাতে বলা হয়েছে, ‘‘ছাত্র রাজনীতির এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য তারা নীতি-নির্ধারণ করবেন। বিরোধী দলকে দমন করার নামে ছাত্র বা যুবসমাজকে তারা উৎসাহিত করবেন না। একইসঙ্গে পুলিশ এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাজ হবে বিরোধী দলীয় রাজনীতির নামে করা বেআইনি কার্যক্রম বা সন্ত্রাস প্রতিরোধ করা।’’

রায়ে বলা হয়, “আমাদের কাছে রেকর্ড অনুযায়ী ৪ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নিজেদের সম্পৃক্ত করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের জবানবন্দিতে যেসব অভিযুক্তদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে শুধু শাকিল চাপাতি দিয়ে এবং রাজন কিরিচ দিয়ে আঘাত করেছে।”

মিডফোর্ট হাসপাতালে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা বিশ্বজিতের শরীরে দুটি আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন নিহতের বড় ভাই উত্তম কুমার দাস, যা অপরাপর সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হয়েছে।

মূলত এ ঘটনার সঙ্গে শাকিল ও রাজন দায়ী। তারা দুজনই অস্ত্র দিয়ে মারাত্মক আঘাত করেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা এ ঘটনাটি ছিল বর্বরতা।

“তাদের এই অপরাধ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং গোটা যুব সমাজ সমর্থন করে না। এ কারণে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম সহানুভূতি দেখাতে পারি না।”

রায়ে বলা হয়, “শাওন, নাহিদ, এমদাদ ও লিমন লাঠি ও লোহার রড দিয়ে বিশ্বজিতকে আঘাত করেছে। তারা ভিকটিমের শরীরে মারাত্মক ধরনের আঘাত করেনি। তাদের অপরাধের ধরন শাকিল বা রাজনের মতো নয়।’’

“তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাদের অতীত ইতিহাস পরিষ্কার। তাদের মধ্যে নাহিদ, শাওন ও এমদাদ পাঁচ বছর ধরে কনডেম সেলে রয়েছে। তারা স্বভাবগত অপরাধী নয়। এ কারণে ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ তিনজনের সাজা মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন দেওয়া ন্যায়সঙ্গত। একই কারণে নূরে আলম লিমনকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়া যুক্তিযুক্ত।”

সাইফুল ইসলাম : আসামি নাহিদ ও শাকিলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে সাইফুলকে অভিযোগপত্রে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া অপর দুই আসামি শাওন ও এমদাদ তাদের জবানবন্দিতে সাইফুলের নাম বলেনি। এমনকি প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী সুইপার পার্বতি হালদার, চা বিক্রেতা মো. শহিদ ও রিকশাচালক রিপন সরকার কাঠগড়ায় সাইফুলকে আসামি হিসেবে শনাক্ত করেনি।

এমনকি সাইফুলকে বারবার রিমান্ডে নেয়া হলেও তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি।

রায়ে বলা হয়, ‘‘অন্যান্য অভিযুক্তদের ঢাকার বাইরে থেকে গ্রেফতার করা হলেও সাইফুলকে তার উত্তরার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার এ আচরণ প্রমাণ করে ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল না।’’

তবে সাক্ষী (মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা) এসআই মাহবুবুল আলম আকন্দ বলেছেন, সাইফুল রড দিয়ে আঘাত করেছে।

দ্বিতীয় তদন্তকারী মো. তাজুল ইসলাম (গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক) তার সাক্ষ্যে সাইফুলের নাম ও অবস্থানের কথা বলেননি।
এছাড়াও সব ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করেও সাইফুলের অবস্থান চিহ্নিত করা যায়নি। আর এ কারণে শুধু দুজনের জবানবন্দির ভিত্তিতে তাকে সাজা দেওয়া যথাযথ হবে না। আর অন্য কোনো সাক্ষী দ্বারা তার উপস্থিতি প্রমাণ না হওয়ায় সাইফুল খালাস পাবার যোগ্য।

কাইয়ুম মিয়া : তাকে শুধু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়। তার বিষয়ে প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেছেন, এ আসামি কাঠের লাঠি দিয়ে ভিকটিমকে আঘাত করেছে।

দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকতা বলেছেন, এ আসামি ভিকটিমকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। কিন্তু প্রকাশ্য আদালতে এটিএন বাংলার ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এ আসামি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল মাত্র। স্থিরচিত্রেও তার উপস্থিতি দেখা যায়। শুধু তার উপস্থিতি প্রমাণ করে না যে সে অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

গোলাম মোস্তফা : শাকিল ও নাহিদের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, মোস্তফা ছুরিকাঘাত করেছে। তবে শাওন ও এমদাদ জবানবন্দিতে বলেছে যে, মোস্তফা শুধু উপস্থিত ছিল এবং দ্বিতীয় কর্মকর্তা তার জবানবন্দিতে বলেছে, গোলাম মোস্তফা রড দিয়ে বিশ্বজিতকে আঘাত করেছে। কিন্তু ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্রে তার উপস্থিতিই দেখা যায়নি।

এ কারণে বিচারিক আদালতের সাজা বহাল রাখা নিরাপদ মনে হয়নি। ‘বেনিফিট অব ডাউট’ সুবিধায় তিনি খালাস পাওয়ার যোগ্য।

এএইচএম কিবরিয়া : স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া ৪ জন কিবরিয়ার নাম বলেছে। ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্রেও ঘটনাস্থলে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। আর শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে দেখার কারণে হত্যার অপরাধে সাজা দেয়া যথাযথ নয়। ফলে তার ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের সাজা বহাল রাখা সম্ভব হয়নি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments