আন্তর্জাতিকতা ছুঁলেও উৎসবে পিছিয়ে

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বিশ্বের নানা নামি-দামি ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরিতে যতটা এগিয়ে আছে, পোশাকে নিজস্ব ‘ব্র্যান্ড’ তৈরিতে ঠিক ততটাই পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে উৎসবকেন্দ্রিক পোশাকের বাজারে দাঁড়াতেই পারছে না দেশি কোম্পানিগুলো। এমনকি অভ্যন্তরীণ বাজারও দখল করে নিয়েছে বিদেশি পোশাক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো এখনো ‘ব্র্যান্ড’ তৈরির দিকে যেমন মনোযোগ দিতে পারেনি তেমনি যে ক’টি কোম্পানি নিজেদের ‘ব্র্যান্ড’ নিয়ে বাজারে এসেছে তারাও ‘মার্কেটিংয়ে’ দেখাতে পারেনি পারদর্শিতা। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি কোনো ব্র্যান্ডের পোশাকেরই আগ্রহোদ্দীপক বাজার তৈরি হয়নি। বিশ্ব তো দূরের কথা খোদ দেশেই সে বাজার গড়ে ওঠেনি এখনো। দেশের পোশাকের বাজার নির্ভরশীল উৎসব-পার্বণের ওপর। দুই ঈদ, পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফালগুন, দুর্গাপূজা, বিশেষ বিশেষ দিবস ও অন্যান্য পার্বণকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি পোশাক বিক্রি হয়। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি জানায়, সারা বছর পোশাক বিক্রি হয় ২০ শতাংশের মতো, বাকি ৮০ শতাংশ বিক্রি হয় বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে। এর মধ্যে সিংহভাগ পোশাক বিক্রি হয় ঈদুল ফিতরের উৎসবেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত পহেলা বৈশাখে অভ্যন্তরীণ পোশাকের বাজার ছিল প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার। এবার ঈদে সে বাজার ছিল প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার। ফ্যাশন উদ্যোক্তারা বলেন, পহেলা বৈশাখের উৎসবে পোশাকের বাজার পুরোটাই বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের দখলে থাকলেও ঈদের পোশাক বাজার চলে যায় ভারত-পাকিস্তানের দখলে। ঈদে দেশি পোশাক থেকে আয় হয় মাত্র চার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। ফলে বিদেশে বাংলাদেশি ব্র্যান্ডকে পরিচিত করে তোলার উদ্যোগের আগে দেশের অভ্যন্তরে দেশি পোশাকের ব্র্যান্ডিং আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পোশাক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্তরা বলছেন, এইচঅ্যান্ডএম, জারা, প্রাইমার্ক, নাইকি, গ্যাপ, ওয়ালমার্টসহ বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোকে তৈরি পোশাক সরবরাহ করে আসছে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো। সেসব কারখানা মালিকদের অনেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের বেশ কিছু নতুন ফ্যাশন ব্র্যান্ড চালু করেছেন। এদের মধ্যে জায়ান্ট গ্রুপের ‘টেক্সমার্ট’ ও ‘ওকাল্ড’, বেক্সিমকো গ্রুপের ‘ইয়েলো’, ব্যাবিলন গ্রুপের ‘ট্রেন্ডস’, ইভিন্স গ্রুপের ‘নোয়া’, অ্যাম্বার গ্রুপের ‘অ্যাম্বার লাইফস্টাইল’, ইপিলিয়ন গ্রুপের ‘সেইলর’, এনার্জিপ্যাক গ্রুপের ‘ও কোড’ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারে ‘আড়ং’, ‘বিবিয়ানা’, ‘রঙ’, ‘বিশ্বরঙ’, প্রবর্তনা, অঞ্জনস, গ্রামীণ, সাদাকালো, কে ক্রাফ্টের মতো দেশীয় ঐতিহ্যনির্ভর ফ্যাশন ও বুটিক হাউসগুলোর কদর বাড়লেও দেশের বাইরে এদের তৈরি পোশাকের ‘ব্র্যান্ড মার্কেটিং’ নেই। তবে গত বছর ৪০ বছর পূর্তিতে ‘আড়ং’ জানিয়েছিল দেশের বাইরে নিজেদের ব্র্যান্ডকে পরিচিত করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে তারা। দেশীয় ঐতিহ্যনির্ভর রঙ, ডিজাইন, কাপড়কে প্রাধান্য দিয়ে পোশাক তৈরি করার করাণে দেশ-বিদেশের বাজারে আড়ংয়ের বিশেষ কদর তৈরি হয়েছে কয়েক দশকে।

২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসে আড়ংয়ে যেতে না পারার আক্ষেপ জানিয়েছিলেন। এতেই বোঝা যায় আড়ংয়ের মতো অন্যান্য দেশীয় ব্র্যান্ডের পোশাকের কদর কতটা বাড়ছে। কিন্তু বিদেশের বাজার তো নয়-ই, দেশের বাজারেও দিন দিন বাংলাদেশি পোশাকের বদলে ভারত ও পাকিস্তানের পোশাকের ব্যবসা প্রসারিত হচ্ছে। এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। কারণ সারা বিশ্বে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের আলাদা কদর রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের উৎসবগুলোতেই কিনা বিদেশি পোশাকে বাজার সয়লাব হয়ে যাচ্ছে!

বিশ্ববাজারে থাকা দেশি ফ্যাশন হাউসগুলোর ব্র্যান্ড ভেল্যু গড়ে না উঠার পেছনে অবশ্য ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ের দুর্বলতাকেই চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগের অভাবকেই দায়ী করা হচ্ছে। সম্প্রতি ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়াতে লন্ডনে দুদিনব্যাপী প্রদর্শনী ‘লন্ডন এক্সপো-২০১৯-এর আয়োজন হয়। সেখানে উৎসবের উদ্যোক্তারা বলেছেন, বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের প্রতি বিদেশিদের আগ্রহ ও আস্থা দিন দিন বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজারের নানা সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু যথাযথ উদ্যোগের অভাবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকের পৃথক বাজার গড়ে উঠছে না। বাংলাদেশের সিল্ক, জামদানি, মসলিন কিংবা তাঁতের শাড়ির খ্যাতি বিশ্বব্যাপী হলেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এ নিয়ে আগ্রহ নেই। এমনকি সামাজিক উৎসবগুলোতেও তেমন একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না এসব পোশাক। এর পেছনে দেশাত্মবোধ, মানসিক দীনতা এবং সরকারি পর্যায়ে ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ের অভাবকেই দুষছেন অনেকে।

একইভাবে দেশের বাজার বিদেশি পোশাকে সয়লাব হওয়ার পেছনেও দেশীয় ব্যবসায়ীদের মুনাফালোভী মানসিকতা এবং নিজেদের তৈরি পোশাকের প্রতি দেশি ভোক্তাদের অবজ্ঞাসূচক দৃষ্টিভঙ্গি দায়ী বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ফ্যাশন উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রতিবছরের মতো এবারের ঈদেও ভারতীয় ও পাকিস্তানি পোশাকের আধিপত্য ছিল অভ্যন্তরীণ বাজারে। এছাড়া বিভিন্ন উৎসবে দেশের বাইরে বিশেষ করে ভারতে গিয়ে ঈদের মার্কেটিং করার রেওয়াজ তৈরি হয়েছে গত কয়েক বছরে। এতে বিশাল অঙ্কের দেশি মুদ্রা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। প্রতিবছর গড়ে তিন লাখ মানুষ ঈদের বাজার করতে ভারত গমন করেন বলে জানা গেছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিনের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম বলেছে, ঈদ পোশাক কেনা বাবদ প্রতিবছর অন্তত তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি ভারতে চলে যাচ্ছে। সেখানে হোটেলে থাকা, ঘোরাফেরা, খাওয়া-দাওয়া ও বিনোদনসহ এ অঙ্ক ছয় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হয়।

এ ব্যাপারে দেশি বুটিক হাউজ বিবিয়ানার স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার লিপি খন্দকার বলেন, বাংলা বর্ষবরণ, কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারির মতো দিনকে ধরে দেশীয় পোশাকের বাজার জমে উঠে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের টার্গেট থাকে মূলত ঈদকে ঘিরে। অথচ ঈদে দেশি বুটিক হাউজগুলো তেমন একটা সুবিধা করতে পারছে না। সেখানে ভারতীয় বা পাকিস্তানি কাপড়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। এর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা যেভাবে ডিজাইন করে যাচ্ছি সেগুলো দিয়েই কিন্তু তিন বছর আগে ভালো ব্যবসা করেছি। কিন্তু তখন করতে পেরেছি কারণ মার্কেট এত ওপেন ছিল না। এখন যত প্রতিযোগিতা বাড়ছে আমরা ডিজাইন নিয়ে তত কাজ করছি। কিন্তু মার্কেটটা এখন এত ওপেন হয়ে গেছে যে, ইন্ডিয়া থেকে লোকজন এসে হোটেল ভাড়া করে পুরোদমে বিজনেস করে যাচ্ছেন, সিজনটাতে কাজে লাগাচ্ছেন তারাও।

লিপি খন্দকার বলেন, ‘ভারত থেকে এই পণ্যগুলো যদি যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে আসে, তাহলে কিন্তু দামের বিষয়টা আমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আসবে না।’

বিদেশি পোশাক বাংলাদেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা প্রসঙ্গে বিক্রেতারা বলছেন, ক্রেতাদের চাহিদা থাকায় তারা ভারতীয় বা পাকিস্তানি পোশাক আনছেন। ক্রেতারা বিভিন্ন অনলাইন এবং টেলিভিশন দেখে এসবের খোঁজ করছেন। আর দেশের ডিজাইনাররা বলছেন, ডিজাইন বা কাপড়ের মানের চেয়েও এখানে তারা মুখ্য মনে করছেন ক্রেতাদের মানসিকতাকে।

এ ব্যাপারে বছর দুয়েক আগে অনলাইন সংবাদ মাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের এক বৈঠকীতে বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন ‘বাংলাদেশিদের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। একটা সময় আমাদের এতটা সক্ষমতা ছিল না। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে দেশের বাইরে শপিং করতে যেতেন না। আমাদের নিজস্ব কোনো প্রোডাক্ট ব্র্যান্ডিং নেই। আমাদের জামদানি ঠিকমতো ব্র্যান্ডিং করতে পারিনি। আমাদের নিজস্ব প্রোডাক্ট ব্র্যান্ডিং করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমার নতুন কনসেপ্ট তৈরি করতে পারি ঈদে মূল্যহ্রাস, যা সব পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। ব্যবসায়ী সংগঠনের গবেষণা বাড়াতে হবে। উৎসব অর্থনীতি নিয়ে আমাদের গবেষণা দরকার। এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো অফিশিয়াল তথ্য নেই।’

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box