আওয়ামী লীগে হাইব্রিড আতঙ্ক

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বিরোধী দল নয়, ক্ষমতাসীন আ.লীগের আতঙ্ক এখন হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারী নেতা। যতই দিন যাচ্ছে দলটির মধ্যে হাইব্রিডদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা।

এসব হাইব্রিড নেতাদের দাপটে আ.লীগ থেকে সরে যাচ্ছে মূল ধারার ত্যাগী নেতাকর্মীরা। যে কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের মাসুল দিতে হতে পারে দলটিকে। আ.লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তথ্য মতে, টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন আ.লীগ এখন হাইব্রিড নেতাদের উর্বর ভূমি। গত দুই মেয়াদে ক্ষমতাসীন আ.লীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোতে অনুপ্রবেশ ঘটেছে অন্তত অর্ধলক্ষ ভিন্ন মতের মানুষ। এদের অধিকাংশ বিগত সময়ে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ছিলেন।

স্থানীয় সাংসদ ও দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের হাত ধরে তাদের আ.লীগের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। মূলত দলীয় গ্রুপিংয়ে নিজের বলয়ে শক্তি বাড়াতে বিরোধী শিবিরের লোকজন ভেড়ান তারা।

অনেক ক্ষেত্রে ঐসব ব্যবসায়ী বা ধনাঢ্য ব্যত্তিদের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে দলে ঢুকানো হয়েছে। ২০০৮ সালে ক্ষমতার আসার পর আ.লীগে এসেছেন, এমন শিল্পপতি খ্যাত আ.লীগ নেতাদের দখলে এখন রাজনৈতিক মাঠ।

এসব ব্যবসায়ী নেতারা এখন দলের জেলা ও উপজেলা আ.লীগের বিভিন্ন পদে আসীন। স্থানীয় সাংসদ ওই ব্যবসীয় নেতার অফিস ও বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করে থাকেন। যার বদৌলতে ঐসব হাইব্রিড নেতাই স্থানীয় আ.লীগের কর্তাব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। সারা দেশের প্রায় প্রতিটি সংসদীয় আসনজুড়েই এমন অবস্থা বিরাজ করছে।

সূত্র মতে, বিগত সময়ে সরকারবিরোধী বিভিন্ন নাশকতা মামলাসহ আ.লীগকর্মী হত্যামামলার আসামিও রয়েছে। নব্য ও হাইব্রিড আ.লীগের কর্মকাণ্ডে বারবার বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয় সরকারকে। বিগত সময়ে ঢাকাসহ সারা দেশে আ.লীগের ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী খুনের ঘটনা ঘটেছে।

এর পেছনে অনুপ্রবেশকারী নেতাদের ইন্ধনের সত্যতা পাওয়া যায়। তারা নিজেদের সুবিধা আদায়ের সাথে সাথে আ.লীগের দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে কোন্দলে সৃষ্টি করছে। শুধু তাই নয়, ওই সকল অনুপ্রবেশকারী ও ভিন্নপন্থি নেতারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাজ করছে অনেকেই। যা নিয়ে দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে হাইব্রিড নেতাদের অপতৎপরতা নিয়ে সকলতে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঐ সময়ে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন।

যত দ্রুত সম্ভব ছদ্মবেশী ঐসব অনুপ্রবেশকারীর সঙ্গ ত্যাগ করে নিজ দলের কর্মীদের মূল্যায়ন করতে দলীয় সাংসদ ও নেতাদের নির্দেশ দেন। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর কয়েকটি জেলা কমিটি হতে জামায়াত বিএনপি থেকে আ.লীগে যোগ দেওয়া অনেক নেতার বিষয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কয়েক স্থানে শেষ চেষ্টা চালিয়েও দলে ঢুকতে পারেনি হাইব্রিড খ্যাত নেতারা।

আ.লীগ সূত্র মতে, আ.লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল আগামী অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ইতোমধ্যে আ.লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলন করার ইচ্ছা পোষন করে প্রস্তুতি নিতে সিনিয়র নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

জাতীয় সম্মেলনের আগেই দলের তৃণমূলে সম্মেলন করার জন্য নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। উদ্যোগ নেওয়া হবে মেয়াদ উত্তীর্ণ জেলা ও উপজেলা কমিটির সম্মেলনের। আর জাতীয় সম্মেলন এবং তৃণমূল সংগঠনের কাউন্সিলের মাধ্যমে দলে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাইকমান্ড। আসন্ন ঈদের পরপরই দলে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে জোরালো শুদ্ধি অভিযান চালানো হবে।

যাদের হাত ধরে অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তাদেরও তালিকা তৈরি করবে। সারা দেশে সাংগঠনিক সফরের জন্য দলের গঠিত আটটি বিভাগীয় টিম ঈদের পর পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করবে। সফরকালে তৃণমূলের নব্য আ.লীগার তালিকা সংগ্রহ করা হবে।

একইসঙ্গে আগামীতে সম্মেলনের মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের দলীয় পদ থেকে সরিয়ে তৃণমূলের জনপ্রিয়, ত্যাগী ও সৎ নেতাদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হবে। সারা দেশের বিভাগ, জেলা ও উপজেলাপর্যায়ের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর সম্মেলন করা, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আ.লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, আ.লীগ দেশের সবচে বড় দল। ক্ষমতাসীন দল হবার কারণে অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। এব্যাপারে কেন্দ্র সতর্ক এবং তৃণমূলকে ইতোমধ্যে নেত্রী সতর্ক করেছেন। অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, এবার সুবিধাবাদীদের অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। সুযোগসন্ধানীরা চিরদিন এটা করে থাকে। আমাদের দলের সিদ্ধান্ত পরিষ্কার— পরীক্ষিত ত্যাগী নেতাকর্মীদের সংগঠন তৃণমূল থেকে নেতৃত্বে আনা হবে।

আ.লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম এমপি বলেন, খাদ্যের মতো আ.লীগের ভেজাল ঢুকে পড়েছে। এখন সময় এসেছে, আ.লীগে দূষিত কোনো রক্ত রাখা হবে না। দলের ভেতরে বা বাইরে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সারা দেশে সার্ভে করে আ.লীগের দূষিত রক্ত খুঁজে বের করবে। আগামী কাউন্সিলে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box