আইএসের নামে দেশি জঙ্গিদের তৎপরতা!

আলোকিত সকাল ডেস্ক

পুরনো জেএমবি, হিযবুত তাহরির, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আনসার আল ইসলাম ও নিউ জেএমবিসহ জঙ্গি সংগঠনগুলো আবারো তৎপরতার চেষ্টা করছে। আর সম্প্রতি সময়ে পুলিশ সদস্যদের টার্গেট করে শক্তিশালী বোমা হামলা ও পুলিশ বক্সকে লক্ষ্য করে বোমার বিস্ফোরণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

আর এসব হামলায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহতও হয়েছেন। আর বোমা হামলা বা বোমা উদ্ধার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের কথিত প্রচার মাধ্যমে দায় স্বীকারও করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জঙ্গি সদস্যরা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যার লক্ষ্যবস্তু নিয়ে নিজেদের জানান দিতে চেষ্টা চালায় পুরোনো জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমন কিছু ব্যক্তির নাম বা তালিকা পেয়ে এরই মধ্যে তাদের সতর্ক করেছে বলে জানা গেছে।

ফলে পুরোনো জেএমবি নতুন করে চিন্তার বিষয় হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে। আর জঙ্গি সংগঠনগুলো নতুন নেতৃত্বে এখন দেশের ভেতরে সংগঠিত হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমপ্রতি কিছু তথ্য ও আলামত পেয়েছে। গত ঈদের আগে জেএমবির জঙ্গিরা দেশের বাইরে থেকেই নাশকতার পরিকল্পনা করছিল।

তবে ভারতে পালিয়ে থাকা জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা সেখানে গ্রেপ্তারের পর তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেয় পুলিশ।

একই সঙ্গে তহবিল জোগাড়ের জন্য অতীতের মতো ডাকাতি শুরু করেছে জঙ্গিরা। একটি ডাকাতির ঘটনার সূত্র ধরে গাজীপুর থেকে মুন্সিগঞ্জের প্রকাশক ও লেখক শাহজাহান বাচ্চু হত্যায় জড়িত জঙ্গি আবদুর রহমান পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।

সূত্র জানায়, আল-কায়েদার মতাদর্শ অনুসারী আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলামও আবার সক্রিয় হওয়ার আলামত পাওয়া যাচ্ছে। জেএমবি ১৯৯৮ সালে জন্ম নেয়।

এরপর গত ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলায় একযোগে ৫০০ বোমা ফাটিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসে। ২০১৬ সালের পর থেকে এই সংগঠনটি তেমন কোনো ঘটনা ঘটাতে পারেনি।

যদিও গত কয়েক বছরে বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যায় জেএমবি জড়িত বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়। দেশে সুবিধা করতে না পেরে জেএমবির একটা অংশ ভারতে আশ্রয় নিয়ে সেখানে সাংগঠনিক বিস্তার ঘটায়।

জেএমবি ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে ও পুলিশ হত্যা করে তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতা সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহিন, জাহিদুল ইসলাম ওরেফ বোমা মিজানসহ তিনজনকে ছিনিয়ে নেয়।

সালাহউদ্দিন ও বোমা মিজান ভারতেই রয়েছে পুলিশের কাছে তথ্য আছে। অবশ্য ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, জঙ্গিদের পক্ষে বড় ধরনের কিছু করার সামর্থ্য নেই এখন।

আর ২০০৮ সালে জন্ম নেয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলাম ২০১৩ সাল থেকে ব্লগার হত্যার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে। তাদের সর্বশেষ হত্যাযজ্ঞ ছিলো ২০১৬ সালের এপ্রিলের কলাবাগানে সমকামী অধিকারকর্মী ও মার্কিন দূতাবাসের কর্মী জুলহাজ মান্নান এবং তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব তনয় হত্যা।

আনসার আল ইসলাম ঘাপটি মেরে থাকলেও লক্ষ্যবস্তু থেকে সরেনি। এদের সামরিক প্রধান চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ জিয়াউল হক। তাকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সংগঠনটির অল্প কিছু সদস্য এখনো কথিত হিজরতের নামে ঘরছাড়া। এখন আইএস মতাদর্শী এই জঙ্গিগোষ্ঠী আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, সেটা নির্ভর করছে জঙ্গিবাদের বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর।

বিশেষ করে যেসব বাংলাদেশি আইএসে উদ্বুদ্ধ হয়ে সিরিয়া বা আফগানিস্তানে গেছেন, তারা দেশে নতুন করে কার্যক্রম বিস্তারের চেষ্টা করেন কি না, এটা গুরুত্বপূর্ণ। আর এবিটি’র সদস্যরা ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের চিহ্নিত গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করছে। রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে বিশেষ সেলের শাহরিয়ার নাফিস ওরফে মো. আম্মার হোসেন (২০), রবিউল ইসলাম ওরফে নুরুল ইসলাম (২৪), রাসেল ওরফে সাজেদুল ইসলাম গিফারী (২৪) এবং আব্দুল মালেকসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে।

এ সময় উগ্রবাদী বই, মোবাইল ও ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করে। আর ২৮ জানুয়ারি সাভারের আশুলিয়া থেকে এবিটির সদস্য আব্দুস ছোবহান ওরফে হাবিবকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
এবিটির অন্যতম পরিকল্পনা হচ্ছে সংগঠনের প্রধান জসিমউদ্দিন রাহমানীকে কারাগার থেকে মুক্ত করাআইনি প্রক্রিয়ার বাইরে কারাগারে হামলা করে হলেও জসিমউদ্দিন রহমানীকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত ছিল। এ জন্য তারা অর্থ সংগ্রহ করেছে।

বাংলাদেশে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিরপুরে ব্লগার ও শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে। রাহমানী জেলে যাওয়ার পর পুরো সংগঠনের দায়িত্ব নেন সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক। জিয়া সেনবাহিনীর কমান্ডো অফিসার ছিলেন এবং তিনি ধরা পড়েননি।

এদিকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরিরের তৎপরতা বেড়ে চলছে। তারা কিছুদিন ঝিমিয়ে থাকলেও মাঝে মধ্যেই দেয়ালে দেয়ালে তাদের আদর্শ ও দাবি প্রচারণার পোস্টার সাঁটিয়ে আসছে।

২০০০ সালের দিকে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে হিযবুত তাহরির। প্রথমে ক্ষুদ্র পরিসরে কার্যক্রম শুরু করলেও ধীরে ধীরে তা বাড়াতে থাকে। এটি একটি উগ্র সংগঠনে পরিণত হয়। এ কারণে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ করা হয় এ সংগঠনকে।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে নির্যাতন অত্যাচারে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আসার পর হিযবুত তাহরির ফের সক্রিয় হয়ে উঠে। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে তৎপর হয়।চলতি বছরের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, ডাকসু নির্বাচনের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নেমেছিলো হিজবুত তাহরির।

গত সোমবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে হিযবুত তাহরির বাংলাদেশের সক্রিয় সংগঠক তানভীর হাসান ওরফে নাঈমকে (৩১) গ্রেপ্তার করে পুলিশের অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিট।

তানভীরের বাসা থেকে সরকারবিরোধী লিফলেট, উগ্রবাদী বই, চারটি মোবাইল, একটি ল্যাপটপ, পেনড্রাইভ ও একটি হার্ডডিস্ক উদ্ধার করা হয়েছে। অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের পুলিশ সুপার (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) মো. মাহিদুজ্জামান মঙ্গলবার রাতে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments