অস্বস্তিতে সরকার

আলোকিত সকাল ডেস্ক

নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণে বেশ ফুরফুরে মেজাজে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। তবে হঠাৎ করেই টানা কয়েকটি সামাজিক সমস্যার মুখে পড়েছে দেশ। আর সেগুলো মোকাবিলা করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের। এছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে সরকার পরিচালনাকারী কর্তাব্যক্তিদের। ফলে অস্বস্তিকর অবস্থার ভেতর দিয়ে দিন পার করছে সরকার।

বেশ কিছুদিন আগ থেকে হঠাৎ করেই দেশে যৌন নিপীড়নের সংখ্যা আশঙ্কাজনক বেড়ে যায়। শিশু থেকে বৃদ্ধা—কেউ রেহায় পাচ্ছে না নিপীড়কদের হাত থেকে। প্রতিদিনই ঘটছে ধর্ষণের মতো ঘটনা। ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হলে বা তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসলেও ধর্ষণ প্রবণতা কমানো যাচ্ছে না। একই সময়ে সারাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বৃদ্ধিতেও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে প্রাণ। ঠিক এক বছর আগেই নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিল শিক্ষার্থীরা। নিরাপদ সড়ক এখনো হয়নি। নানামুখী জনসচেতনামুলক কার্যক্রম পরিচালনার পরও কমানো যাচ্ছে না সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে গুজবকে কেন্দ্র করে সারা দেশজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। আর বর্তমানে বন্যা ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে সমাজে বেশ অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমন অবস্থার ভেতর দিয়ে চলছে দেশ। এসব অস্থিরতা বা সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আলাদা আলাদা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

দেশে রাজনৈতিক ইস্যু না থাকায় রাজপথে নেই সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তবে সামাজিক সমস্যাগুলোকে ইস্যু হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন তারা। সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ডেঙ্গু, খুন ও ধর্ষণ প্রতিরোধে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিকদল গণফোরাম।

দলের নির্বাহী সভাপতি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী আবু সাইয়িদ অভিযোগ করে বলেন, ডেঙ্গু, খুন, ধর্ষণ ও বন্যা সব মহামারিতে রূপ নিয়েছে।

চলমান বন্যা ও দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপের জন্য সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

সোমবার রাজধানীর এক সভায় তিনি বলেন, বন্যা আমরা বন্ধ করতে পারতাম না। তবে বাংলাদেশ সরকার যদি ভারত সরকারের সঙ্গে কথা বলে, তাদের বাঁধগুলো একসঙ্গে ছেড়ে না দিয়ে পর্যায়ক্রমে ছাড়তে বলতো, তাহলে বন্যা কমানো সম্ভব হতো। কিন্তু এই সরকারের ব্যর্থতার কারণেই দেশে এই বন্যা হচ্ছে। ডেঙ্গু আগেও ছিল উল্লেখ করে সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের সময়ও ডেঙ্গু হয়েছিল। কিন্তু আগে থেকে প্রস্তুত থাকার কারণে এতটা হয়নি। এ বছর আগাম বৃষ্টি হওয়ার কারণে আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু তারা আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়নি। এ কারণে চরম অবস্থা বিরাজ করছে। এটা তাদের ব্যর্থতা।

তবে এসব সমস্যাকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছেন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা মনে করছেন সমস্যা থাকবে, তবে সেগুলোর সমাধানও রয়েছে। ক্ষমতাসীনদের দাবি, সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করা হচ্ছে কি না, সেটায় দেখার বিষয়। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার কারণে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই যায়। কিন্তু এসব সমস্যা তৈরির হওয়ার আগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেয়া যায় না।

সমন্বয়হীনতার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে কি না—সোমবার আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সম্পাদকমণ্ডলীর সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে দলের সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আমার মনে হয় সব ব্যাপারেই শেখ হাসিনা সরকারের পাশাপাশি আমাদের পার্টি এগিয়ে এসেছে। সবসময়ই আমরা একটিভ ছিলাম এবং যেকোনো অশুভ বা অস্থির পরিস্থিতিতে আমরা কখনো নিষ্ক্রিয় থাকিনি। সরকারিভাবে আমরা সবসময় এগিয়ে এসেছি, দলীয়ভাবেও আমরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছি।

এসব সমস্যাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। সামাজিক সমস্যার বিষয়ে তিনি বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, বিভিন্ন সমস্যা থাকবেই। এগুলো মোকাবিলা করার দল আওয়ামী লীগ। বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতি বা ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। এ ছাড়া অনেকে গুজব ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। এই পরিস্থিতিগুলো আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছি। আমরা সামাজিকভাবে এই পরিস্থিতিগুলো মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ কর্মসূচিরও ঘোষণা দিয়েছে। সুতরাং, আমাদের ইনএকটিভনেস নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো উপায় নেই। দেখার বিষয় কাজ হচ্ছে কি না। আর এর আগেও জনগণ সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করেছি।

এদিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে উদ্বেগজনকভাবে। এডিস মশার প্রাদুর্ভাব ও ডেঙ্গুর প্রকোপ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যাচ্ছে না। তবে রাজধানীর দুই মেয়রের বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে দেশজুড়ে বইছে সমালোচনার ঝড়। সম্প্রতি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাকে পদ্মা সেতু তৈরিতে মাথা লাগার মতো গুজব বলে উড়িয়ে দেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন। একই সময়ে ডেঙ্গু মশার প্রজনন ক্ষমতা রোহিঙ্গাদের মতো বলে মন্তব্য করে দেশজুড়ে সমালোচিত হন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। পরে মেয়র নিজেই ভুল শুধরে নেন তিনি। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এসব বেফাঁস মন্তব্যকে স্লিপ অফ টাং বলে উল্লেখ করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। এ বিষয়ে তিনি বলেন, তারা ফেরেশতা বা দেবতা নয়, এ কারণেই হয়তো তাদের ভুল হতে পারে।

তবে এসব সমস্যার কারণে ভেতরে ভেতরে অস্বস্তিতে রয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা আর দায়িত্বশীলদের বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। এ ছাড়া প্রতিদিনই ধর্ষণ, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, ডেঙ্গুর মহামারী আকার ধারণ—সব মিলিয়ে সরকারকে বেশ চাপে পড়তে হয়েছে। তবে সাধ্যমতো সব সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালিত হলেও থেমে নেই সমালোচনা।

এদিকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির বিষয়ে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের আগেই সতর্ক করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) সানিয়া তাহমিনা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এবারের মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গু রোগী বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগেই করেছিল এবং সে ব্যাপারে সতর্ক হতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে চিকিৎসকদের সচেতন করতে চিঠি পাঠায়। এরপর মার্চ মাসে অধিদপ্তরের এডিস সার্ভের প্রতিবেদনে দেখা যায়, শুষ্ক মৌসুমেও যথেষ্ট এডিস মশা আছে। এ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বলা হয় এবং তা না করা হলে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।

চোখের চিকিৎসাজনিত কারণে বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তবে দেশের এমন পরিস্থিতিতে তিনি লন্ডনে বসে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হবে বা কী কী বিষয়ে করণীয় রয়েছে, সেগুলোর দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।

সোমবার আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সভা চলাকালে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মোবাইলে যুক্ত হন শেখ হাসিনা। ওই সময় তিনি প্রায় আধঘণ্টা দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। সভাশেষে এ বিষয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, তিনি আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন। ২৫ থেকে ৩০ মিনিটের মতো তিনি আমাদের সঙ্গে আলাপ করেছেন এবং প্রয়োজনীয় করণীয় সম্পর্কে আমাদেরকে পরামর্শ দিয়েছেন, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments