অন্ধকার পেশার বর্ণনা দিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী

দেশের একটি নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিভাবে জড়িত হলেন যৌনপেশা বা কলগার্ল সার্ভিসে। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মনেয়া মেয়েটি এইসএসসি পাশের পর যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির তখনই তার বাবা তাদের সংসারের একমাত্র অবলম্বন ছোট্ট ব্যবসাটি চরম লোকসানে পড়ে। সঙ্গে কপাল পুড়ে পুরো পরিবারের।

এরপর থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়াতে মেয়েটিকেই হাল ধরতে হয় পুরো পরিবারের। আর এক পর্যায়ে প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে সে হারায় তার সম্ভ্রব, তার সর্বস্ব। এরপর শুরু হয় এক নতুন জীবন, চলতে থাকে অন্ধকারের জগতে তার পথচলা।

পরিবারের সংকট থাকার কারণে বিভিন্ন যায়গায় চাকরি খোঁজ করেন। আবার জবস বিজ্ঞাপন দেখে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য আবেদন করেন। বেশির ভাগ যায়গায় কাজের অভিজ্ঞতা চায় কিন্তু তার কোন অভিজ্ঞতা নেই। পরিবারের সংকট আবার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হতে হবে। হতাশার মধ্যেই দিন কাটছে তার। এরই মধ্যে গুলশানে একটি অফিসে ভাইবা দেয়ার জন্য ডাকা হয় এই শিক্ষার্থীকে। কয়েকদিন পর ফের ভাইবা দেওয়ার জন্য তাকে ডাকা হয়। অতঃপর তাকে বলা হয় তাদের অফিসার আছে ভাইবা দেয়ার জন্য ওখানে নিয়ে যাওয়া হবে।

এই তরুণী বলেন, আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিন্তু জায়গাটা হচ্ছে হোটেল রেডিসন। এটা কোন অফিস মনে হচ্ছিল না। অনেকক্ষণ পরে একজন লোক আসলো তাকে অফিসারের মতোই মনে হচ্ছিল। দেখতে পেলাম আমাকে জিনি নিয়ে গেলেন তার হাতে অফিসারের মতো যেই লোকটা কিছু টাকা ধরিয়ে দিলেন। তখন আমার মনে একটু খটকা লাগলো। ওনাকে কেন টাকা ধরিয়ে দিচ্ছেন। তখন আমি একটু ভয়ও পেলাম। কখনোতো এরকম পরিস্থিতিতে পড়িনি। আমাকে জেনে নিয়ে গেলেন উনি আমার নিকটে আসলো। তাকে জিজ্ঞেস করলাম ইন্টারভিউ কি হবে? উনি টাকা দেখিয়ে বললো বুঝতে পেরেছো তুমি? আমি বললাম কি বুঝতে পারবো? তখন উনি বলল বাকিটা তোমার কাজ। তখন আমি কি করবো কিছু বুঝতে পারছিলাম না। তখন আমি বুঝতে পারছিলাম না যে আমি কি করবো? আমি কি চলে যাবো নাকি চিৎকার করবো। উনি বললো কাজটা তোমাকে করতে হবে। ওনাকে সময় দিতে হবে।

‘কাউকে সময় দেয়া মানে কি এটা আমি বুঝতে পারলাম। তখন আমি তাকে বললাম এটা আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। আমি এটা পারবোনা, আমি কি করে সময় দিব? আমাকে যেই লোকটা ওখানে নিয়ে গেলেন তিনি আমাকে বললেন তোমার যদি চাকরিটা দরকার হয়, যদি চাকরিটা করতে চাও তাহলে মনে হয় কাজটা করা দরকার। আবার হুমকি দিয়ে বলেছিলো এই কাজটা না করলে কোন কাগজ ফেরত দেয়া হবে না। এ কথা বলে ওই লোকটা চলে গেলে। তখন আমি বুঝতে পারছিলাম না কি করবো। অফিসার এর মত দেখতে লোকটা আমার সামনে বসে আছেন। তখন আমি ভাবলাম আমার লেখাপড়া করা দরকার, ছোট ভাই, বোন, বাবা-মা আছেন। আমার তখন মনে হলো আমি যদি তাদের দিকে হাত বারাই যদি সহোযোগিতা করি তাহলে তারা ভালো থাকবে। ওই লোকটা আমার সামনে আসলেন তিনি বললেন এখান থেকে বের হওয়া যাবে না। তখন আমি তাকে অনেক রিকোয়েস্ট করলাম বলেছিলাম আমাকে এখান থেকে যেতে দেন, কিন্তু উনি আমার কোন কথাই শোনেন নি। উনি আমাকে অনেক জোর করেছেন।’

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী বলেন, তখন যা হওয়ার তা তো হয়েই গেল। কি পরিমাণ টাকা তাকে পরিশোধ করেছিলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, দশ হাজারের মতো ছিলো। তখন আমি বাসায় গিয়ে একেবারে ভেঙে পরি। নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হয়। কোন জিনিসে আমার মন বসছিলো না। কারো কাছে বলতেও পারছিনা, বলার কোন বিষয়ও না। আম্মা জানতে চেয়েছিলেন কি হয়েছে, কিন্তু এর কোন উত্তর আমি দিতে পারি নি। তখন নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করি। যে যা হওয়ার তাতো হয়েই গেছে। অতঃপর এই টাকা দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হই। পাশাপাশি বইপত্র যা যা প্রয়োজন সব কিছু ক্রয় করি।

তিনি বলেন, আমার মনে হয়েছিল আমি কেন মরে যাবো। আমাকে বাচে থাকতে হবে। ওরা বলেছিলো মাসে তিনটা কাজ করতে হবে।

‘কিছুদিন যাওয়ার পর অন্ধকার জগতে কাজ করে এমন একটা গ্রুপে এ্যাড হলাম। এই গ্রুপের যিনি এ্যাডমিন ছিলেন তিনি কারো কাছ থেকে কোন বিনিময় নেয় না। তিনি কাজ যোগাড় করে দেয়। এভাবেই অন্ধকার জগতে প্রবেশ করি। একসময় আমি বুঝতে পারি কিভাবে যোগাযোগ করতে হয়। কিভাবে নিজেকে হাইড রাখতে হয়।

এ কাজ করতে গেলে কখনো নিজেকে অপরাধী মনে হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব সময় মনে হয়, আবার মাঝে মাঝে মনে হয় না।

টাকা পয়সা আর প্যাকেজের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাকা পয়সার বিষয় হচ্ছে যারা আসে তাদের অবস্থা বুঝে। যার অর্থনৈতিক অবস্থা একটু ভালো সে হয়তো একটু বেশি দিচ্ছে।

কিভাবে যোগাযোগ হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রুপে পোস্ট দেই, কন্টাক্টটা ইনবক্সে হয়। তার পর ফোনের মাধ্যমে কন্টাক্ট করা হয়। যায়গাটা কিভাবে নির্ধারণ করা হয় এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের গ্রুপের অনেকে আছে যারা পরিবার সহ থাকে। ওখানে যাওয়া হয়, কিন্তু যায়গা গুলো অনেক নিরাপত্তার। কেউ ঝামেলা করবে এমন কোন সমস্যা নেই। গেস্ট হিসেবে যাই। আসার সময় আমার যা আয় হয়, এখান থেকে দুই বা তিন হাজার তাদের দিয়ে আসতে হয়।

এখানে কারা আসে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেশির ভাগ হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবী, বে-সরকারি চাকরিজীবী আবার অনেক স্টুডেন্টও আসে। স্টুডেন্টদের কাজ আমি একটু কম করি। কারন আমি নিজেও একজন স্টুডেন্ট এজন্য তাদের কাজ আমি করি না। বেশির ভাগ ৩৫ বছরের উপরে লোকজন বেশি আসে।

এপর্যন্ত আপনি কতজনের সাথে মিট করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৩৫ থেকে ৪০ জনের মতো হবে। ঢাকার ভিতরেই কাজ গুলো করা হয়। ছয় থেকে আট হাজার টাকা কন্টাক্ট হয়। অনেকে থাকার পরে বলে ভুত থেকে টাকাটা তুলে দিচ্ছি। দেখা যায় তার আর খোঁজ খবর নেই। আবার অনেকে টাকা কম দিয়ে যায়। বলছে পরবর্তীতে দিব। পরবর্তীতে অনেকে দিয়ে দেয়, আবার অনেকে দেয় না। আবার অনেকে বাজে ব্যাবহার করে। মনে হয় আমরা কোন মানুষ না। আমাদের সাথে মানুষের আচরণ করে না। এটা কোন জীবন হতে পারে কি না জানিনা। এটা আসলে কোন লাইফ না। আমি চাই এখান থেকে প্রতিনিয়ত বের হতে। আমি চাই আরও পাঁচটা মানুষ যেভাবে থাকে আমিও সেভাবে থাকি।

এই শিক্ষার্থী বলেন, আমি এ জীবন চাই না। আমি এখান থেকে বের হতে চাই। লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করতে চাই। আমি জানিনা এখান থেকে সমাজ আমাকে কিভাবে বের করবে, কিন্তু আমি এখান থেকে বের হতে চাই।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি দেশের বেসরকারি সময় টেলিভিশন-এ সংবাদটি প্রকাশিত করা হয়। সেই আলোকেই আমাদের এই প্রতিবেদনটি করা হয়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments