অন্ধকারেই চামড়া শিল্পনগরী

আলোকিত সকাল ডেস্ক

কাজ শুরু হয় ২০০৩ সালে। মাঝপথে দেড় দশকে একাধিকবার সংশোধন করে প্রকল্পের পুরো কাজ ২০১৯ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার সময়সীমা পার হয়ে গেছে। তবুও হলো না কাজ শেষ। অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭৩ শতাংশ।

তাই বাকি কাজের জন্য আরো দুই বছর সময় চেয়ে শিল্পমন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এতে পরিকল্পনামন্ত্রী ‘হ্যাঁ’ বললেই সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

ব্যতিক্রম হলে আলোচিত-সমালোচিত প্রকল্পটি আদৌ সফলতা বা শতভাগ আলোর মুখ দেখবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এটি যেনতেন কোনো প্রকল্প নয়, বুড়িগঙ্গা নদী রক্ষা ও বিশ্বে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সেই ‘চামড়া শিল্পনগরী, সাভারের বাস্তব চিত্র।

শুধু এটি নয়, শিল্পমন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) প্লাস্টিক শিল্পসহ সিরাজগঞ্জ, রাজশাহীসহ অধিকাংশ প্রকল্পের একই দশা। সময় শেষ হলেও প্রকল্পের কাজ হচ্ছে না শেষ।

বিদায়ী অর্থবছরে চলামান ২৭ প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৪৪ শতাংশ। এ জন্য প্রকল্প সংশোধনের হিড়িক পড়ে গেছে। যার ফলে সময় যতই বাড়ছে, ততই অপচয় হচ্ছে সরকারি অর্থ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে বিসিকের চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান চামড়া শিল্প নগরী প্রকল্পের ঢিলেমির কারণ হিসেবে আমার সংবাদকে বলেন, ঠিকাদারের সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দিলেও বিসিক তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেনি। তবে আমি দায়িত্ব নেয়ার পরে আলোচনা শুরু করা হয়েছে। জুন পর্যন্ত এ প্রকল্পের ৭৩ শতাংশ কাজ হয়েছে।

তাই বাকি কাজ শেষ করতে একটু সময়, তা ছয় মাস লাগতে পারে। এ জন্যই প্রকল্পটি সংশোধন দরকার। অনুমোদনের জন্যই পরিকল্পনা কমিশনে ডিপিপি পাঠানো হয়েছে। ট্যানারি মালিকরা বিভিন্ন অভিযোগ করলেও তিনি এ ব্যাপারে আমরা এলার্ট আছি।

কুরবানির সব চামড়া নিতে প্রস্তুতি ভালোই আছে। অপর এক প্রশ্নের ব্যাপারে তিনি বলেন, চামড়াজাত পণ্য থেকে অন্যান্য পণ্য তৈরির জন্য ২০০ একর জমিতে আলাদা প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে।

অধিকাংশ প্রকল্পের বাস্তবায়নের হার খুবই কম। এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, বিসিক প্লাস্টিক শিল্পনগরীতে জমির ব্যাপারে মামলা ছিলো। তবে ডিসির সঙ্গে কথা হয়েছে।

তাড়াতাড়ি ভূমি অধিগ্রহণে আর কোনো সমস্যা হবে না। সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীও অনেক পিছিয়ে রয়েছে কেন? এ ব্যাপারে তিনি বলেন, নেভি একটা বাজে ডিপার্টমেন্ট। তারা মাটি ভরাটের দায়িত্ব নিয়েও ঠিকমতো কাজ করতে পারেনি।

রাউজান বিসিক শিল্পনগরীও অনেক পিছিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাজে প্রকল্প পরিচালক-পিডিদের কারণে এটা হয়েছে। তার ব্যর্থতার কারণে বাদ দিয়ে অন্যকে পিডির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

বিসিকের বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৪৪ শতাংশ। প্রায় প্রকল্প সংশোধন করতে হচ্ছে— এমন প্রশ্নের উত্তরে অতিরিক্ত সচিব বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পর বিসিকের ৬২ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম শতভাগ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মষূচি-এডিপি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। তাই আশা করি বাস্তবায়নের গতি এখন থেকে বাড়বে।

শিল্পমন্ত্রণালয়সহ একাধিক সূত্র জানায়, ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ হাজারীবাগ এলাকা থেকে আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থাসহ বুড়িগঙ্গা নদী রক্ষা করতে ২০০৩ সালের ১৬ আগস্টে সরকার সাভার চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকা শীর্ষক একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। ব্যয় ধরা হয় ১৭৫ কোটি টাকা। তা ২০০৫ সালে শেষ করার জন্য সময়ও বেধে দেয় সরকার। শুরুও হয় এর নির্মাণকাজ।

এরপরে বিভিন্ন সময়ে সরকার বনাম ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ শুরু হয় ট্যানারি সরাতে। এটি বাস্তবায়নের জন্য আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শিল্পমন্ত্রণালয় এক বছর সময় বাড়িয়ে সংশোধনও করে। কাজে গতি না আসায় পরিকল্পনা কমিশন পরে ছয় মাস সময়ও বাড়ায়।

তারপরও কাজের কাজ না হওয়ায় ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় ৫৪৫ কোটি টাকা। সঙ্গে সময়ও বাড়ানো হয় চার বছর। তবুও ঝুলে যায় প্রকল্প স্থান্তরের কাজ। ২০১৭ সালের ৮ অক্টোবর সরকার আবার সংশোধন করে সময় বাড়ায়।

সময়ও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার ৭৯ কোটি টাকা। এভাবে সময় চলে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি ঢাকাকে পরিষ্কার রাখার প্রকল্পটি।

কমন ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান-কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণসহ বিভিন্ন দাবিতে ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ এবং আমদানিকারকদের চাপ আমলে নিয়ে যুগোপযোগী করতে সরকার ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর আবার প্রকল্পটি সংশোধন করে।

তাতে আধুনিক ফায়ার সার্ভিস নির্মাণ, সিইটিপি, এসটিপি, এসপিজিএস নির্মাণসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যোগ করা হয়। ব্যয় এক হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা ঠিক রেখে সময় বাড়ানো হয় ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। পরিবেশদূষণ থেকে মানুষ এবং নদী বাঁচাতে উচ্চ আদালত শিল্প মন্ত্রণালয়কে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেন।

২০১৩ সালে প্লটের নকশা অনুমোদনের পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান বিসিক থেকে ট্যানারির মালিকদের বহুবার তাগাদা দেয়া হয়েছে ট্যানারি সরাতে। একাধিকবার লিগ্যাল নোটিসও দেয়া হয়েছে।

এরপরও ট্যানারি সরাতে মালিকরা এগিয়ে আসেননি। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের কথা বললেই মালিকরা সিইটিপি নির্মাণ শেষ না হওয়ার অজুহাত দেখিয়েছেন। বাধ্য হয়ে সরকার হাজারীবাগের সব ট্যানারির বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগসহ অন্যান্য সুবিধাও বন্ধ করে দিলে একটু গতি বেড়েছে।

বিসিক থেকে সাভারে প্রায় ২০০ একর জমিতে মোট ২০৫টি প্লটে ১৫৫টি ট্যানারি স্থানান্তরের জন্য ট্যানারিমালিকদের বরাদ্দও দিয়েছে।

তবে প্লট বরাদ্দ বাতিল, বরাদ্দ না দেয়া ও হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ থাকায় এখন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) ১৪৩টি ট্যানারি স্থানান্তরের সুযোগ করেছে। ট্যানারি মালিকরাও গেছেন।

সবার চাপ থাকায় ইতোমধ্যে প্রকল্পের আওতায় ড্রেন, কালভার্ট, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, কেন্দ্রীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, পুলিশ ফাঁড়ি, প্রশাসনিক ভবন, পাম্প ড্রাইভার কোয়ার্টার নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। সিইটিপির চারটি মডিউল পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে।

গত জুনে সময় শেষ হলেও কাজের অগ্রগতি শতভাগ হয়নি। প্রকল্পের শুরু থেকে গত জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৭৯২ কোটি টাকা বা ৭৩ শতাংশ। বাকি কাজ শেষ করতে আবারো দুই বছর সময় চাচ্ছে শিল্পমন্ত্রণালয়।

২০০৩ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত সময় লাগবে চামড়া শিল্পনগরীর পুরো কাজ শেষ করতে। পরিকল্পনা কমিশনে এর সংশোধনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী এর সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দিলেই কাজ শুরু হবে।

এরপর পিইসি সভা শেষে একনেক সভায় অনুমোদনের উপস্থাপন করা হবে। তবে একটি সূত্র জানায়, বারবার সংশোধনের কারণে এটা পাস হবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ তিনবারের বেশি সংশোধনের চেয়ে নতুন করে প্রকল্প প্রণয়নে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

এদিকে রাজধানীতে বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকাণ্ড অসংখ্য প্রাণহানি হলেও বিসিক প্লাস্টিক শিল্পনগরীটিও ঠিক সময়ে শুরু করতে পারেনি কাজ। নির্ধারিত চার বছর গত জুনে শেষ হয়েছে।

কিন্তু অগ্রগতি মাত্র ৩৭ শতাংশ। শুধু তাই নয়, ২০১০ সালে নিমতলীতে কেমিক্যাল বিস্ফোরণের পরে ঢাকার সব কেমিক্যাল কারখানা ও গোডাউন কেরানীগঞ্জে সরাতে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর সরকার ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী, ঢাকা’ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়।

কিন্তু কাজে গতি না আসায় মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে বিসিক কেমিক্যাল পল্লী স্থাপনে সম্প্রতি সরকার সংশোধিত এ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। জুন পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ।

রাজশাহী বিসিক শিল্পনগরী-২ প্রকল্পটি ২০১৪ সালে শুরু হয়ে ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে গত জুনে বাস্তবায়ন হয়েছে ৬৮ শতাংশ।

তাই বাকি কাজ শেষ করতে প্রকল্পটি সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সময় দুই বছর বাড়িয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যয় ১২৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৭৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিসিক শিল্পপার্ক, সিরাজগঞ্জ প্রকল্পটি ২০১০ সালে শুরু হয়েছে। তা দ্বিতীয়বার সংশোধন হয়ে গত জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু তবুও হলো না শেষ অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৩ শতাংশ।

শুধু তাই নয়, বিসিক শিল্পনগরী, কুমারখালীর ২০১০ সালে শুরু হয়ে ২০১৭ সালে শেষ হওয়ার কথা। রুগ্ন এ প্রকল্পটিতে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে তালিকায় রাখা হয়েছে। শুরু শেষে এ পর্যন্ত এক শতাংশও বাস্তবায়ন হয়নি। চলতি অর্থবছরেও একই অবস্থা। মাত্র লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।

বিসিক শিল্পনগরী, রাউজান প্রকল্পটি ২০১৬ সালে শুরু হয়ে গত জুনে শেষ হবার কথা। কিন্তু অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ।

শুধু এটির যে দুরবস্থা তা নয়, বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীর অনুন্নত এলাকা উন্নয়ন এবং উন্নত এলাকার অবকাঠামো মেরামত ও পুনঃনির্মাণ প্রকল্পটির অবস্থাও শোচনীয়।

২০১৭ সালের শুরু হয়ে আগামী ডিসেম্বরে এর কাজ শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments