অধিনায়কের মুকুট ভরা কাঁটা!

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ওয়ানডেতে আপনার আগে যে ১৩ জন অধিনায়ক বাংলাদেশের, তাঁদের নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচে দল জিতেছে মাত্র দুইবার।’

তামিম ইকবাল : তাই নাকি!

‘ক্যাপ্টেনদের বেশির ভাগই তো ব্যাটসম্যান। তবু অধিনায়কত্বের অভিষেকে তাঁদের কারো সেঞ্চুরি নেই।’

তামিম : তাই? জেনে রাখলাম।

আগের দিন কলম্বোর তাজ সমুদ্র হোটেলে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের অধিনায়ক। কাল এলেন ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে। প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের তিনতলায় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন। এরপর ‘সাক্ষাৎকারে আরো দুটি তথ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হয়নি’ বলে তামিমকে তা জানিয়ে দেওয়া। তিনি শুনলেন। কিছুটা অবাক হলেন। আর ছোট্ট দুই শব্দ ‘জেনে রাখলাম’-এর মাধ্যমে বোধ করি বুঝিয়ে দিতে চাইলেন অনেক কিছু।

তাতে মিশে রইল যেন বাংলাদেশের তৃতীয় অধিনায়ক হিসেবে আজ নিজের ওয়ানডে অভিষেকে দলকে জেতানোর প্রতিশ্রুতি। আর প্রথম হিসেবে সেঞ্চুরির প্রতিজ্ঞা। পারবেন কি তামিম?

বাংলাদেশের ১৪তম ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে আজ টস করতে নামবেন এই বাঁহাতি ওপেনার। আগের ১৩-র মধ্যে দেশের ক্রিকেটের ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’ যুগে বেশির ভাগের নেতৃত্বের অভিষেক। জয় তখন বাংলাদেশের জন্য সোনার হরিণ। দেখুন না, নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচে জয়ের জন্য বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয় অষ্টম অধিনায়ক হাবিবুল বাশার পর্যন্ত! আর ২০০৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারের সেই জয় তো বাংলাদেশের জন্যই ৪৭ ওয়ানডে পরের জয়। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে মহাকাব্যিক অর্জনের প্রায় পাঁচ বছর পর ৫০ ওভারের ফরম্যাটে বিজয়ীর বেশে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ!

নেতৃত্বের অভিষেকে দলের প্রায় অবধারিত পরাজয়ের মতো অধিনায়কদের পারফরম্যান্সও যেন নিয়তিনির্দিষ্ট বিবর্ণ। গাজী আশরাফ হোসেন থেকে শুরু করে খালেদ মাহমুদ, মোহাম্মদ আশরাফুল থেকে মুশফিকুর রহিম—রাঙানো পারফরম্যান্স প্রায় কারোই না। আমিনুল ইসলাম, হাবিবুল বাশার কিংবা সাকিব আল হাসানরা সেখানে শুধুই ব্যতিক্রম।

শুরুটা শূন্যে। বাংলাদেশের প্রথম অধিনায়ক গাজী আশরাফ নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচে খুলতে পারেননি রানের খাতা। ১৯৮৬ এশিয়া কাপে মোরাতুয়ার সে খেলায় পাকিস্তানের বিপক্ষে দল অল আউট ৯৪ রানে। এরপর হার সাত উইকেটে। অফ স্পিনে অবশ্য জাভেদ মিয়াঁদাদের উইকেট পান গাজী আশরাফ। পরের অধিনায়ক মিনহাজুল আবেদীনের পরিসংখ্যানও ভুলে যাওয়ার মতো। চণ্ডীগড়ে ১৯৯০ এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ হারে ৯ উইকেটে। কপিল দেবের বলে বোল্ড হওয়ার আগে অধিনায়কের ১৮ বলে ৯ রান। এরপর বোলিংয়ে ৯ ওভারে ৪৩ রান দিয়ে উইকেটশূন্য। আকরাম খান ক্যারিয়ারের ৪৪ ওয়ানডের মধ্যে অধিনায়ক ১৫টিতে। যার প্রথমটিতে ১৯৯৫ এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে শারজায় ছয় নম্বরে নেমে করেন ৪২ বলে ২৪ রান। দলের হার ৯ উইকেটে।

প্রথম ব্যতিক্রম আমিনুল। বাংলাদেশকে জেতাতে পারেননি হয়তো। তবে ১৯৯৮ ত্রিদেশীয় সিরেজে চণ্ডীগড়ে ভারতের বিপক্ষে নেতৃত্বের পথচলায় প্রথম ম্যাচে খেলেন ১২৬ বলে ৭০ রানের ইনিংস। ৩৯ ওয়ানডের ক্যারিয়ারে সেটিই তাঁর সর্বোচ্চ। নাঈমুর রহমানের অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচ ২০০০ সালের নক আউট বিশ্বকাপে; ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাইরোবিতে। ব্যাটিংয়ে ৬ নম্বরে নেমে ৬০ বলে করেন ৪৬; ওপেনার জাভেদ ওমরের অপরাজিত ৬৩-র পর যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কিন্তু দল তো ঠিকই হেরে যায় আট উইকেটে। অফ স্পিনে ৬ ওভারে ৪০ রান দিয়ে অধিনায়ক পাননি কোনো উইকেট।

নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচে খালেদ মাসুদও দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার। ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রামের ম্যাচটিতে সাত নম্বরে নেমে তাঁর ৭৮ বলে ৪০ রানের ইনিংস। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘সম্মানজনক স্কোরের’ সে যুগে সেটি হাততালি পেয়েছে হয়তো; তবে তা দলের জয়ের ন্যূনতম সম্ভাবনাও জাগাতে ব্যর্থ। বাংলাদেশ হারে পাঁচ উইকেটে। আর পরের অধিনায়ক খালেদ মাহমুদের প্রথম টস করার ম্যাচের হার তো ২০০ রানের বিশাল ব্যবধানে; ২০০৩ সালের টিভিএস কাপে ভারতের বিপক্ষে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। প্রতিপক্ষকে ২৭৬ রানে অল আউট করায় অধিনায়ক ৭.৩ ওভারে ৪৬ রানে দুই উইকেট নেন বটে; ব্যাটিংয়ে আট নম্বরে ২০ বলে ১০ রানও করেন। কিন্তু বাংলাদেশ যে অল আউট ৭৬ রানে!

এরপর হাবিবুল। সর্বার্থে সব পূর্বসূরিকে তাঁর ছাড়িয়ে যাওয়া। ১১১ ওয়ানডে ক্যারিয়ারের যে ৬৯টিতে তিনি অধিনায়ক, এর প্রথম ২০০৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ওয়ানডেতে প্রায় পাঁচ বছর জয়হীন দলকে জেতান প্রথম খেলাতেই। ৫০ ওভারে সাত উইকেটে বাংলাদেশের তোলা ২৩৮ রানে ৮০ বলে ইনিংস-সর্বোচ্চ ৬১ রান হাবিবুলের। ৮ রানে জেতা ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হতেই পারতেন; সে পুরস্কার শেষ পর্যন্ত ওঠে ৩২ বলে অপরাজিত ৫১ রান করা আশরাফুলের হাতে। তবে অমন হিরণ্ময় রাতে ম্যাচ সেরার মতো ‘তুচ্ছ’ বিষয় নিয়ে ভাবতে বয়েই গেছে অধিনায়কের।

হাবিবুলের ইনজুরিতে ২০০৪ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের জার্সিতে টস করতে নামেন রাজিন সালেহ। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে নেতৃত্বের অভিষেকে দ্বিতীয় বলে শূন্য রানে আউট তিনি; দল অল আউট ৯৩ রানে। এরপর পরাজয়ের আনুষ্ঠানিকতায় ব্যবধান ৯ উইকেটে। অভিষেকে অধিনায়কের নায়ক হতে না পারার পরের সংযোজন আশরাফুল। ২০০৭ সালে কলম্বোর পি সারা ওভালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনি করেন ৮ বলে ৪। বাংলাদেশ হারে ৭০ রানে।

সাকিব ব্যর্থ হননি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরো অনেক রূপকথার মতো নেতৃত্বের অভিষেকটাও মধুর এই অলরাউন্ডারের। ২০৬ ওয়ানডের মধ্যে যে ৫০টিতে অধিনায়ক, এর প্রথমটি ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ডমিনিকায়। সেখানে হাবিবুলের পর অভিষেকে দ্বিতীয় বিজয়ী সেনাপতি তিনি। বাংলাদেশের ৫২ রানের জয়ে ৬০ বলে ৫৪ রান করেছেন; এরপর বোলিংয়ে আট ওভারে ২৬ রানে এক শিকার। হাবিবুলের চেয়ে আরো অনায়াসে ম্যাচ সেরা হতে পারতেন। কিন্তু ৯.৪ ওভারে ৩৯ রানে চার উইকেট পাওয়া বাঁহাতি স্পিনার আবদুর রাজ্জাককে বেছে নেওয়া হয় সে পুরস্কারের জন্য।

এরপর মাশরাফি বিন মর্তুজা ও মুশফিকুর রহিম। আবার হতাশা। ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নটিংহামে মাশরাফির ওয়ানডে নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ হারে ছয় উইকেটে। ৬ ওভারে ৩০ রান দিয়ে উইকেটশূন্য অধিনায়ক। আর ২০১১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঢাকায় প্রথমবারের মতো টস করতে নামা মুশফিক ২১ বলে ২১ রানের বেশি করতে পারেননি। পারেননি দলের ৪০ রানের পরাজয় রুখতে।

তামিম কি পারবেন আজ? সে জন্য না হয় পূর্বসূরিদের রেকর্ডের উজান বাইতে হবে তাঁকে! কিন্তু তামিমের ওই ‘জেনে রাখলাম’ শব্দ দুটি তো প্রতিজ্ঞা-প্রতিশ্রুতির অনুচ্চ ঘোষণা দিচ্ছে! ভরসা রাখতে বলছে। বাংলাদেশের কারো যে ওয়ানডে অধিনায়কত্বের অভিষেকে জয়, সেঞ্চুরি এবং ম্যান অব দ্য ম্যাচের ত্রিমুকুট অর্জন নেই—আজ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচের পর সে রেকর্ডটাও না উল্লসিত তামিমকে মনে করিয়ে দিতে হয়!

আস/এসআইসু

Facebook Comments